Homeআন্তর্জাতিকআবেগ সরিয়ে হামাস দর্শন

আবেগ সরিয়ে হামাস দর্শন

উপমহাদেশে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য ইংরেজরা “ডিভাইড এন্ড রুল” পলিসি ব্যবহার করেছিলো৷ হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ্ব তৈরি করে ব্রিটিশরা নিজেদের  কর্তৃত্ব বজায় রাখতে রেখেছিলো ভারতীয় উপমহাদেশে।

সাম্প্রতিক ইসরায়েল ফিলিস্তিন ইস্যুতে আবারও ডিভাইড এন্ড রুল পলিসির কথা মনে পড়লো৷ ইসরায়েলকে অনেকটা ব্রিটিশদের সাথে তুলনা করা যায়৷ ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দুটো গ্রুপের দ্বন্ধ তৈরি করে ইসরায়েল ফিলিস্তিনে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে চেয়েছে৷

ফিলিস্তিনের একটি ইসলামিস্ট আন্দোলনের আধ্যাত্মিক  নেতা ছিলেন আহমেদ ইয়াসিন। ৭০ এর দশকে কায়রো থেকে ফিরে এসেই তিনি একটি চ্যারিটি এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন৷ এটিকে তৎকালীন ইসরায়েলী প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার ইয়াসির আরাফাতের ফাতাহর বিপরীতে কাউন্টার হিসেবে দাঁড় করানোর পরিকল্পনা নেন৷

শুরুর দিকে স্কুল কলেজ,  হাসপাতাল, মসজিদ  এবং এতিমখানা প্রতিষ্ঠা, বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয় এই সংগঠনটি৷ ইসরায়েল আর্থিক সাহায্য প্রদান করা সহ বিভিন্ন ভাবে এই ইসলামিস্ট গ্রুপটাকে দাঁড় করাতে সাহায্য করে ৷

১৯৮৪ সালে একটি গোপন অস্ত্র ভাণ্ডারের সন্ধান পাওয়ার পর আহমেদ ইয়াসিনকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়৷ আশ্চর্যজনকভাবে ১ বছর পরেই তাকে মুক্তি দেয়া হয় এবং পুনরায় তিনি তার কার্যক্রম শুরু করেন৷ ১৯৮৭ সালে ফিলিস্তিনিদের প্রথম “ইন্তিফাদা” শুরু হওয়ার পর আহমেদ ইয়াসিন হামাস প্রতিষ্ঠা করেন৷ হামাস মূলত মুসলিম ব্রাদারহুডেরই অঙ্গ সংগঠন, বাংলাদেশের জামায়তে ইসলামের মত৷

 

চিত্র-১ঃ ১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদার সময় বিক্ষোভকারী ফিলিস্তিনি জনগণ।

১৯৮৭ সালে হামাস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে থেকেই অর্থাৎ ৭০ এর দশক থেকেই এই ইসলামিস্ট গ্রুপটাকে ডেভেলপ করতে ইসরায়েল সাহায্য করেছে৷ কারণ ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে ফাতাহ যখন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে লড়ে যাচ্ছিলো তা ইসরায়েলের জন্য ছিলো বেশ চিন্তার কারণ ,  তাছাড়া ফাতাহর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও ইসরায়েলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠে৷  তাই ইসরায়েল সেক্যুলার ন্যাশনালিস্ট ফাতাহর বিপরীতে রিলিজিয়াস ইসলামিস্ট হামাসকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে৷

অনেকটা হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ্ব তৈরি করে ব্রিটিশদের এই উপমহাদেশে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার মতো ।  শুধু হামাস নয়,  হামাসের একসময়ের মিত্র হিজবুল্লাহকেও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে ইসরায়েল।

বর্তমান এই সংকটে এই ব্যাপারটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের চলমান এই দ্বন্ধে দুই রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভবনাও দেখা যাচ্ছে না।  ভবিষ্যতে যদি দুই রাষ্ট্র সমাধান আসেও সেক্ষেত্রে ফিলিস্তিন ইহুদি পাড়া ভরতি একটি রাষ্ট্রে পরিণত হবে৷ কারণ ইতিমধ্যেই ইসরায়েলি ইহুদিরা ফিলিস্তিনের বিভিন্ন অংশে বসতি স্থাপন করেছে৷

তবে হামাস দুই রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে না, কারণ হামাস যদি দুই রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে কথা বলে সেক্ষেত্রে তারা ফিলিস্তিনিদের সমর্থন হারাবে৷ কারণ ফিলিস্তিনিরা মনে করে পুরো জমি ফিলিস্তিনের,  ইসরায়েল নামের কোন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব তারা স্বীকার করতে চায় না৷ এই জমি ফিলিস্তিনের হলেও বর্তমান সময়ে ইসরায়েল অঘোষিত সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়েছে৷ কাজেই বর্তমান প্রেক্ষাপটে  গো ধরে বসে থাকলে মোটেও কোন সমাধান আসবে না৷ তাছাড়া গত ১১ দিনে চলমান যুদ্ধ আবারও প্রমাণ করেছে যে ইসরায়েল ফিলিস্তিন যুদ্ধ একটি পুরোপুরি অসম যুদ্ধে পরিণত হয়েছে ,  ভালোভাবে বুঝতে গত ১৪ বছরে ইসরায়েল ফিলিস্তিন যুদ্ধের হতাহতের পরিসংখ্যান দেখা যেতে পারে৷

২০০৮-০৯ সালে ইসরায়েল এবং  ফিলিস্তিনের সংঘর্ষে ১৪০০+ ফিলিস্তিনি সাধারণ নাগরিক নিহত হয়,  ২০১৪ সালে ৫০ দিন ব্যাপী চলা সংঘর্ষে প্রায় ২১০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়,  ২০১৮ সালে ১৭০ জন এবং সর্বশেষ গত ১১ দিনের সংঘর্ষে ২৫০+ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।

অন্যদিকে গত এই চারটি যুদ্ধে ইসরায়েলী নাগরিক নিহত হয়েছে যথাক্রমে  ১৩ জন, ৭৩ জন এবং ১২ জন৷ অর্থ্যাৎ গত ৪ টি যুদ্ধে ৪ হাজারের অধিক ফিলিস্তিনি নিহত হলেও, ইজরায়েলে হতাহতের সংখ্যা ১০০ র ও নিচে৷ কাজেই এই যুদ্ধ যে একটি অসম যুদ্ধ তা সুস্পষ্ট।

হামাসের গত ১১ দিনে কয়েক হাজার রকেট নিক্ষেপ করাকে গ্লোরিফাই করে প্রচার করাটা আমার মতে অর্বাচীনতা। বেশিরভাগ রকেটই ইসরায়েলের মাটি স্পর্শ করেনি। অনেকের মতে হামাসের ছোড়া রকেটকে নিষ্ক্রিয় করতে ইসরায়েলকে যে আয়রন ডোম ব্যবহার করতে হয়েছে তা ইসরায়েলকে অর্থনৈতিক ভাবে কাবু করতে পারবে, কারণ আয়রন ডোম বেশ ব্যয়বহুল। এ প্রসঙ্গে একটি জিউস প্রবাদের কথা মনে পড়ছে,  ” কোন সমস্যা যদি টাকা দিয়ে সমাধান করা যায় তবে সেটি কোন সমস্যা নয়, সেটি শুধুমাত্র ব্যয় “।  আর ইসরায়েল অর্থনৈতিকভাবে কতটুকু শক্ত অবস্থানে আছে সে সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল। আমার ধারণা গত কয়েকদিনে ইসরায়েল আয়রন ডোমের যে মহড়া দেখিয়েছে,  আগামীতে বিভিন্ন দেশগুলোর কাছে ইসরায়েল আয়রন ডোম বিক্রি শুরু করবে৷

চিত্র-২ঃ লিকুদ পার্টির নেতা এবং ইজরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়হু। 

ইসরায়েলের বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নাম লিকুদ পার্টি, ডানপন্থী কট্টর এই দলটির নেতা এবং ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।  সামনের নির্বাচনে তার পক্ষে জয় লাভ করা ছিলো বেশ কষ্টকর৷ কাজেই তার নির্বাচনে পিছিয়ে থাকা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরানো ছিলো জরুরি। লিকুদ পার্টির অপজিশন ইসরায়েলের ক্ষমতায় আসলে ফিলিস্তিন ইস্যুতে আলাপ আলোচনার একটা সুযোগ হয়তো তৈরি হতো৷

কিন্তু হামাসের এই উপর্যুপরি রকেট হামলা আদতে ইসরায়েলে লিকুদ পার্টির ভোটই বাড়িয়ে দেয়৷ কারণ হামলাগুলোকে শক্ত হাতে দমন করে নেতানিয়াহু ইসরায়েল বাসীকে এই বার্তা দিলেন যে তিনি ছাড়া ইসরায়েলকে রক্ষা করার মত আর কেউ নেই৷ কাজেই এই বার্তা দিয়ে ইসরায়েলী পার্লামেন্ট নেসেটে নিজের অবস্থান আবারও সুসহংত করলেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু৷

গত ১১ দিনের সংঘাতের পর হামাস নিজেদের এই যুদ্ধে জয়ী ঘোষণা করেছে। হামাস নিজেদেরকে জয়ী ঘোষণা করার মাধ্যমে ইসরায়েল সবসময় যা বলে থাকে অর্থাৎ “আত্মরক্ষার তাগিদে” ইসরায়েলের  ফিলিস্তিনে হামলা করাটাকে হামাস বৈধতা দিয়ে দিলো৷ যার ফলে যে যুদ্ধাপরাধ ইসরায়েল সংঘটিত করলো ফিলিস্তিনে গত ১১ দিনে তা আবারও ঢাকা পরে গেলো৷

এই যুদ্ধে হামাস এবং নেতানিয়াহু উভয়ই জয়ী, কারণ উভয়ই নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করেছেন ৷ হামাস নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করে মিছিলও বের করেছে, অবশ্য এর কারণও রয়েছে৷ সংঘাতের ফলে গাজা বর্তমান সময়ে একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কাজেই ধ্বংস হওয়া বিভিন্ন স্থাপনা পুনঃনির্মাণের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন  সেই অর্থ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা,  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে আসবে৷ আর ২০০৬ সালের নির্বাচনের পর ফাতাহকে গাজা থেকে বের করে দেওয়ায় বর্তমানে গাজার একচ্ছত্র অধিপতি হামাস৷

কাজেই যে অর্থ সাহায্য গাজা পাবে তার প্রায় পুরোটাই হামাসের পকেটে যাবে,  এটিকে এক অর্থে  হামাসের বিজয় হিসেবেই দেখা যায়৷

এদিকে হামাসের এই হঠকারিতার মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ ফিলিস্তিনি নাগরিকদের। হামাসের সেরকম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও নেই।  আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন সহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ হামাসকে জঙ্গী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে৷ মাহমুদ আব্বাসের ফাতাহকেই বিশ্ব নেতারা ফিলিস্তিনের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে মনে করেন।

এখানে উল্লেখ্য ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে ফাতাহ শুরুতে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুললেও বর্তমান পরিস্থিতি সাপেক্ষে তারা কূটনৈতিক সমাধানই চাচ্ছে৷ মূলত ৯০ এর দশকেই ফাতাহ সশস্ত্র রাস্তা থেকে বেরিয়ে আসে এবং ৯৩ সালে দুই রাষ্ট্র সমাধানের লক্ষ্যে অসলো চুক্তি স্বাক্ষর করে৷

ইয়াসির আরাফাত সশস্ত্র রাস্তা ছেড়ে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে হাঁটায় অনেকে তাঁকে আপোসকামী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।আমার মতে আপোসকামী নন, ইয়াসির আরাফাত ছিলেন বাস্তববাদী। তিনি ইসরায়েল ফিলিস্তিন দ্বন্ধের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন৷ কাজেই তিনি কূটনৈতিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালান,  এবং সে লক্ষ্যে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন অনেকটাই৷  ফাতাহ বুঝতে পেরেছিলো অতি উৎসাহী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কোনভাবেই অন্যতম পরাশক্তি ইসরায়েলের সাথে টক্কর দেয়া যাবে না, এতে হিতে বিপরীত হবে,  যা বর্তমানে হামাসের কার্যকলাপের ফলে হচ্ছে৷

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের পাশ্ববর্তী বন্ধু রাষ্ট্র ভারত এবং অন্যতম পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের পাশে ছিলো। কিন্তু ফিলিস্তিন সংকটে পাশ্ববর্তী আরব রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিনের পাশে নেই৷ প্যান আরবিজম এবং প্যান ইসলামিজমের গ্রহনযোগ্যতা দিনদিন কমে যাওয়ায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে ধীরে ধীরে ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় আরব রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের সাথে তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে৷ ইরানের রাজনৈতিক এবং সামরিক উন্নতি,  লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বৃদ্ধির ফলে আরব রাষ্ট্রগুলো যথেষ্ট চিন্তিত। কাজেই বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র ইসরায়েলের সাথে তাদের সম্পর্ক তৈরির কোন বিকল্প নেই।

কাজেই কোন  শক্তিশালী মিত্র এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া হামাস যে হঠকারী কার্যক্রম চালাচ্ছে তার কোন ফল ফিলিস্তিনিরা পাচ্ছে না,  বরং প্রতিটি সংঘাতের ফলে অসংখ্য নিরীহ ফিলিস্তিনি তাদের প্রাণ হারাচ্ছে৷ প্রতিটি সংঘাতের ফলে যে বিপর্যয় গাজাবাসীরা প্রত্যক্ষ করে তার কোন মূল্য হামাসের কাছে নেই৷ যে হামাস ইসরায়েলের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম নিয়েছে তারা ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ রক্ষা করবে এমন  ভাবা অর্বাচীনতা।

হামাস নামক এই চোরাবালি থেকে ফিলিস্তিনিরা যতোদিন না বের হতে পারবে,  ততোদিন ইসরায়েল ফিলিস্তিন দ্বন্ধের কোন সমাধান আশা করা যাচ্ছে না৷

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured