Homeতত্ত্বআমাদের বিবেক ও আত্ন-সম্মানবোধঃ সামাজিক নির্মাণবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে

আমাদের বিবেক ও আত্ন-সম্মানবোধঃ সামাজিক নির্মাণবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে

আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ার বাহিরে বসে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা ও হট্টগোলে মত্ত। হুট করে দেখলেন একটা পথশিশু আপনার কাছে বকুল ফুলের মালা বিক্রি করবে বলে আপনার হাতে সুন্দর করে একটি মালা গছিয়ে দিলো। আপনি হ্যা ও না কিছু বলার সুযোগই পেলেন না। তারপরও, আপনার মধ্যে মহত্ত্ব আছে বলেই হয়তো বেচারির মালা না নিয়ে তাকে ১০টা টাকা দান করে দিলেন। কিন্তু সর্বনাশ! পথশিশু তা কিছুতেই নিবে না, বরং বলবে আপনি যে তাকে ১০টাকা দিতে ইতস্তত হয়েছেন, এতেই সে অনেক খুশি। বরঞ্চ, সে আপনাকে ফুলের মালাটা বিনামূল্যেই দিয়ে দিতে চাচ্ছে। কারণ, সে ভিক্ষা নিবে না। তাকে সমাজ ও পরিবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিতে না পারলেও এইটুকু অবুঝ পথশিশুর মধ্যে আমার-আপনার চেয়ে অধিকতর আত্ন-সম্মানবোধ রয়েছে।

আরেকটা কাহিনী বলি। এক্জন বিত্তবান  ও প্রভাবশালী বাবার ছেলে কোন কিছুকে তোয়াক্কা না করে মদ্যপ অবস্থায় দিন-দুপুরে মার্সিডিজ-বেঞ্জ গাড়ি চালাচ্ছিলো। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর ফলে একসময় সে স্টিয়ারিংের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, সামনের একটি রিকশাকে সজোড়ে ধাক্কা দেয়। ভাগ্য ভালো থাকায় রিকশা থেকে একজন মধ্যবয়সী বিধবা মা ও তাঁর ইন্টারমিডিয়েট পড়ূয়া মেয়ে পড়ে গিয়ে গুরুতর ভাবে হাতে-পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। রিক্সা চালকের মাথা ফেটে অঝোড়ে রক্ত পড়তে থাকে। কিন্তু বিত্তবান  ও প্রভাবশালী বাবার ছেলেটা সে দিকে কি না কি হলো, সেটা ভ্রুক্ষেপ না করে চলেই গেলো। অন্যদিকে, আশেপাশের অনেক মানুষ দূর্ঘটনাস্থলে সমবেত হতে লাগলো। অথচ তারা একটিবারও বললো না যে বড়লোক বাপের ছেলের আত্ন-সম্মানবোধ বলে কিছু নেই, মানুষের জীবণের প্রতি মূল্য ও সম্মানবোধও নেই।

এখন আসল কথায় আসি। একটা ফুলবিক্রেতা পথশিশু আপনাকে বিনামূল্যে ফুল দিয়ে তার আত্নসম্মানবোধ প্রকাশ করলো, আর একজন বিত্তবান  ও প্রভাবশালী বাবার ছেলের কান্ডের জন্য একটি মা তার মেয়ে এবং রিকশাচালক প্রায় মরতে বসেছিলো, সেটাকে কেন লোকজন আত্নসম্মানহীনতা বলে নাই?

Social Constructivism বা সামাজিক নির্মাণবাদের যুক্তিতে সবকিছুই দেশ ও সমাজে বসবাসরত মানুষের দ্বারা সৃষ্টি। আমাদের বেশিরভাগের কাছেই পথশিশুটার আত্নসম্মানবোধ ও একটি মা ও মেয়ের নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বেচে যাওয়ার কোন মূল্য নেই। কারণ একটা পথশিশুর টাকা পয়সা নেই যে সে সম্মান দাবী রাখে। আবার একজন বিত্তবান  ও প্রভাবশালী বাবার ছেলে গাড়ি ধাক্কা দিয়ে কাউকে গুরুতর আহত করলেই সাতখুন মাফ! কারণ আর কিছুই না, বিত্তবান  ও প্রভাবশালী বাবার ছেলের অহরহ টাকা আছে।

মানুষ নিজের অজান্তেই এমন কিছু বাস্তবতা তৈরি করে বসে, যেখানে মূল্যবোধের কোন স্থান থাকে না। আমরা মনে করি টাকা থাকাই সব। আমরা Materialist (বস্তুবাদী) হয়েই পড়ে থাকি। অথচ এই Materialism এর কারণে আমরা যে পথশিশুটার আত্নসম্মানবোধের স্বীকৃতি দিতেও পারছি না আবার ওই বড়লোক বাপের ছেলের কৃতকর্মের জন্য তিরস্কারও করতে পারছি না। কেননা টাকাই সব। অথচ টাকা দিয়ে আত্নসম্মানবোধ জাগ্রত করা যায় না।

আমাদের সমাজব্যবস্থা হলো Structure বা কাঠামো আর আমরা নিজেরাই হলো সেটার Agency বা সংস্থা। মোদ্দাকথা, আমাদের কর্মযজ্ঞ ও বিবেক-বুদ্ধির উপর নির্ভর করেই এই সামাজিক Structure বা কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটে। আমাদের সমাজিক কাঠামো যদি আত্নসম্মানের চেয়ে টাকাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়, আমরা Agency বা সংস্থা হিসেবে কি পারি না আত্নসম্মানবোধকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে জনপ্রীয় করে তুলতে?

এখন অনেকেই বলতে পারে যে বিত্তবান  ও প্রভাবশালী বাবার ছেলের যেহেতু টাকা আছে, তাই তাকে ধরপাকর করে লাভ নাই। কেননা, সে টাকার জোড়ে ঠিকই জেল থেকে বের হয়ে যাবে। এখন আমার প্রশ্ন হলো, এখানে যে অরাজকতা (Anarchy) সৃষ্টি হলো ছেলেকে বিনা বাধায় পালাতে দিয়ে, এমন কি নিশচয়তা আছে যে ছেলেটা আরো মানুষকে তার দায়িত্বজ্ঞানহীন ড্রাইভিং দিয়ে আহত/নিহত করবে না, অরাজকতা (Anarchy) সৃষ্টি করবে না?

আমি আর যাই করি, এই অরাজকতা সৃষ্টি করার জন্য কিছুতেই সেই বিত্তবান ও প্রভাবশালী বাবার ছেলেকে দোষ দিবো না। কারণ এই অরাজকতা সৃষ্টির জন্য আমাদের গোটা দেশ ও সমাজই দায়ী, কেননা সে সমাজ Materialism বা বস্তুবাদের কারণে নিজের বিবেক-বুদ্ধিকে তালাবদ্ধ করে রেখেছে। টাকাকে অতিমাত্রায় গুরুত্ব দেই বলেই সেই বেপরোয়া ছেলেকে ধড়-পাকড় করার প্রয়োজনও বোধ করি না।, তাই আলেকজান্ডার ওয়েন্ডট বলেছেন যে “Anarchy is what states/we make of it”। মানে, অরাজকতা আমাদের দ্বারাই সৃষ্ট, এটার জন্য অন্য কেউ দায়ী না।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured