Homeআন্তর্জাতিকআলিবর্দি থেকে মমতা: বর্গি খেদানোর লড়াই

আলিবর্দি থেকে মমতা: বর্গি খেদানোর লড়াই

সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষের দিন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরিয়েছে এবং  মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস বিশাল জয় পেয়ে গদিতে আসীন হয়েছে। বহু দলের মধ্যে নির্বাচন হলেও মূল লড়াই ছিলো দ্বিপাক্ষিক – বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে। বিজেপি উত্তরভারতের পরে বাংলায় মাটি শক্ত করতে উঠে পড়ে লেগেছিলো কেননা দক্ষিণে সে সুবিধে করতে পারছে না, পাঞ্জাব তার নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই ২০২৪ লোকসভার আগে নতুন রাজনৈতিক উইন্ডো খুলতে বাংলাকেপাখির চোখ করেছিলো।  আরএসএসের দীর্ঘ দিনের নিঃশব্দ কাজ, গত লোকসভায় ভালো ফল, বিভিন্ন জায়গায় হিন্দিভাষীদের আধিপত্য, মোদি ম্যাজিক বিজেপিকে মেকি আত্মবিশ্বাস যোগাচ্ছিলো। বিজেপি চেয়েছিলো ধর্মীয় মেরুকরণ, কথিত অবৈধ অনুপ্রবেশ, দলিত ভোট, মতুয়া জনগোষ্ঠী, জঙ্গলমহল, মমতা ও তার পরিবারকে ব্যক্তি আক্রমণ,  দূর্নীতি এবং দশ বছরে মমতা সরকারের প্রতি জনগণের স্বাভাবিক বিরুদ্ধমতকে কাজে লাগিয়ে ২০০ আসন পেতে । অন্যদিকে মমতা শাণ দিয়েছিলেন নারী ভোটার, সংখ্যালঘু ভোট, দশ বছরে দেয়া বিভিন্ন প্রকল্প, নিজের ইমেজ, কেন্দ্রে ও অন্যান্য রাজ্যে বিজেপির ব্যর্থতা এবং বিজেপিকে একটি উত্তরভারতীয় বাঙালি বিরোধী দল হিসেবে তুলে ধরে  বাঙালি অস্মিতা জাগিয়ে মোটামুটি আয়াস করে এককভাবে বহুমত পেতে।

বাংলা বলতে বোঝাতো অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ অর্থাৎ বিহার, বাংলা ও উড়িষ্যা। ১৭৪০ সালে আলিবর্দি খাঁন সরফরাজ খানকে পরাজিত ও নিহত করে বাংলার নবাব হন। সরফরাজ খাঁর শ্যালক তথা উড়িষ্যার উপশাসক রুস্তম জং আলিবর্দি খাঁর কর্তৃত্ব অস্বীকার করেন। আলিবর্দি, রুস্তম জংকে যুদ্ধে পরাজিত করে নিজের ভাইপোকে উড়িষ্যার উপশাসক নিয়োগ করেন। রুস্তম জং নাগপুরের মারাঠা শাসক প্রথম রঘোজি ভোঁসলের সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং মারাঠাদের সাহায্যে রুস্তম জং উড়িষ্যার অধিকার পুনরুদ্ধার করেন। এদিকে মারাঠারা বাংলার পশ্চিম সীমান্তবর্তী গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক লুটতরাজ শুরু করে এবং  আলিবর্দি পুনরায় উড়িষ্যায় এসে রুস্তমকে পরাজিত করেন। নবাব মুর্শিদাবাদে প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই ভোঁসলে মারাঠা সর্দার ভাস্কর পণ্ডিতকে অশ্বারোহী বাহিনীর নেতা  করে বাংলায় পাঠান। তারা পেছন পথে  বাংলায় প্রবেশ করে ব্যাপক লুণ্ঠন চালাতে থাকে। ইতিহাসে এদেরকেই বর্গি বলে আখ্যা দেয়া হয়। নবাব আলিবর্দি ধূর্ততার সাথে ভাস্কর পণ্ডিতকে সন্ধি প্রস্তাব দিয়ে ডেকে হত্যা করেন। ১৭৪১- ১৭৫১ এক দশকে চার থেকে ছয়টি বড় বর্গি আক্রমণ প্রতিহত করেছেন নবাব আলিবর্দি খাঁ। শেষ যুদ্ধে রঘোজি ভোঁসলে নিজে পরিবারসহ উপস্থিত থেকে যুদ্ধে লড়েছেন।

আলিবর্দি খাঁ ‘র  প্রভূত পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন সত্ত্বেও বর্গি আক্রমণ ঠেকাতে সমর্থ হননি। মারাঠা অশ্বারোহীদের গতি ও দক্ষতার সামনে অসহায় ছিল নবাবের সৈন্য। গঙ্গা-হুগলি নদীই বর্গি হানা ঠেকাতে সক্ষম হয়েছিলো।  ১৭৫১ সালে আলিবর্দি খাঁ মারাঠাদের সঙ্গে সন্ধি করে উড়িষ্যার অধিকার ছেড়ে দিলে  বাংলায় বর্গি হানা বন্ধ হয়।

বাংলার সমাজ কাঠামোতে “বর্গি” শব্দটি এত বৈচিত্রপূর্ণরূপে আসন গেড়ে রয়েছে যা রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দাবী রাখে। এক দশক বর্গি আক্রমণে বাংলার অর্থনৈতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। ঐতিহাসিক পি জে মার্শাল বেঙ্গল: দ্য ব্রিটিশ ব্রিজহেড: ইস্টার্ন ইন্ডিয়া বইয়ে বাংলায় বর্গি হানায় প্রায় ৪ লক্ষ বাঙালির প্রাণসংহারের কথা উল্লেখ করেছেন। বাংলা ভাষার অভিধান বিশেষজ্ঞ পবিত্র সরকার বর্গি এবং বাংলায় বাহিরাগত, ভিনসাংস্কৃতিক ও লুঠতরাজকারীদের সমার্থক বলেছেন। একটি লোকপ্রিয় সঙ্গীতের লাইন, “পারুল বোন ডাকে চম্পা ছুটে আয়/ বর্গিরা সব হাকে কোমর বেঁধে আয়।”  রাজ্যবাসী তাদের দিদি মমতা বন্দোপাধ্যায়ের মাঝেই এই পারুল বোনকে খুঁজে নিয়েছেন এবং ধিতাং ধিতাং বোলে চম্পার মতো ছুটে গিয়ে ভোট দিয়েছেন। কৈশোরে মা-ঠাকুমারা  যখন ছড়া কাটতেন  “খোকা ঘুমালো, পাড়া জুরালো, বর্গী এলো দেশে / বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দিবো কিসে?” তখন থেকেই বর্গিদের প্রতি যে বিদ্বেষ বাঙালি সমাজ লালন করে বেড়ে ওঠে সেটি হিন্দুভূমের সংস্কৃতি ধারণকারী বিজেপি নেতৃত্ব উপলব্ধি করেনি।

স্বয়ং মমতা নিজেও হয়তো ভাবেন নি তার দল ২১৩ আসনে বিজয়ী হবে। বামপন্থী, সংখ্যা লঘু ও সচেতন ফ্যাসিবাদ বিরোধী মানুষ বিজেপিকে ঠেকাতে তৃণমূলে ভোট দিয়েছেন। প্রথমে উল্লিখিত কারণগুলো দুই দলেই ভেবে থাকলেও বিষয় ছিলো মাত্র একটিই “সামাজিক – সাংস্কৃতিক একাত্ববোধ”। এক দেশ, এক ধ্বজ, এক ভাষার ধারক বিজেপি ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধের কথা কল্পনাও করতে পারে না। হিন্দুদের রক্ষক বিজেপি পশ্চিমবাংলায় বাঙালির আপনজন হয়ে উঠতে পারে নি। অনবরত হিন্দি কচকচানি বাংলায় নোবেল পাওয়া জাতি মেনে নেয়নি। ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করা কেন্দ্রিয় নেতাদের হিন্দিতে বলা ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলায় থাকা অবাঙালিদের ফণা তোলা স্থানীয় মানুষ ভালো ভাবে নেন নি। মধ্যবিত্ত, পড়াশোনা জানা যারা বাবু কালচারে বিশ্বাসী তাদের কাছে বিজেপির ভারে শিক্ষিত মার্জিত নেতার অভাব চোখ এড়ায়নি। জগদীশ চন্দ্র,  প্রফুল্ল কিংবা সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো বিজ্ঞানীর জন্ম দেয়া জাতি গোমূত্রে সব রোগের সমাধান এবং গরুর দুধে সোনা পাওয়ার মতো বিজ্ঞানে আস্থা রাখেনি। প্রেম ভালোবাসায় ভরপুর বাংলা যোগী আদিত্যনাথের এন্টি রোমিও স্কোয়াডে নিজের ভালোবাসাকে মরতে দিতে চায়নি। সত্যজিৎ – সৌমিত্রকে আইকন মানা বাঙালি গিরগিটির মতো রংবদলু রুদ্রনীল গং দের ভোটে হারাবে এটাই প্রত্যাশিত ছিলো। বিহারে মায়ের বিসর্জনে গুলি করে লোক মারা, উত্তরপ্রদেশে শারদীয় দূর্গোৎসব বন্ধ করে ছট পুজোর অনুমতি দিয়ে বাঙালির দেবী দূর্গাকে রুষ্ট করার ফল বিজেপি অবশেষে পেলো। বাঙালির প্রিয় খাদ্য চিড়া খাওয়া দেখে কৈলাসজি বুঝতে পেরেছিলেন সেই লোকটি বাংলাদেশি এবং অভাবের তাড়নায় চিড়ে খাচ্ছে। বাঙালিরা তাই মা সরস্বতীর পুজোয় দধিকর্ম করে বুঝিয়ে দিলো কৈলাশজি মা আপনাকে আর যা দিক, জ্ঞান দেয়নি। প্রসঙ্গত, দধিকর্ম করতে চিড়ে লাগে।

এই সবগুলো কারণকে সংঘবদ্ধ করে মমতা ব্যানার্জি ভাঙা পায়ে গোল দিয়েছেন। খেলা হবে স্লোগান নিয় প্রশ্ন তোলা বিজেপি বুঝতে পারেনি ইস্টবেঙ্গল- মোহনবাগান নিয়ে খেলার প্রতি বাঙালির আবেগ। পশ্চিমবাংলার ইতিহাসে এই প্রথম বাঙালিয়ানার প্রশ্নে ভোট হলো এবং ভাষা- সংস্কৃতির জাতীয়তাবাদ জয়লাভ করলো। স্ট্রিট ফাইটার উপাধির সাথে জাতীয়তাবাদী পালকটাও মমতার সাথে যুক্ত হলো। অত্যধিক নেতার দলত্যাগ করে বিজেপিতে যোগদান, দিদিকে কটাক্ষ করতে গিয়ে নারীবিদ্বেষ সামনে আসা এসব সুচারুরূপে কেন্দ্রিভূত করে তৃণমূলের ভোট শেয়ার বাড়িয়েছেন প্রশান্ত কিশোর।  জাতীয়তাবাদের কী সমাপতন!  ২রা মে ফলাফল ঘোষণার দিন, সত্যজিৎ রায়ের শততম জন্মবার্ষিক; এর কিছুদিন বাদে ৭ মে কবিগুরুর জন্মদিন; বিজেপিকে সাংস্কৃতিক বর্গি তুলে ধরতে সোনায় সোহাগা রূপে কৈলাস বিজয়বর্গির নাম কিংবা আরএসএস ও বর্গি উভয়ের ই ঘাঁটি নাগপুর।রৌদ্র লেখে জয় কবিতায় কবি শামসুর রাহমান বর্গির বিরুদ্ধে জয়ের কথা বলেছেন। বিপুল অভিযোগ, নানা ব্যর্থতা, পা ভেঙ্গে যাওয়া, দলে ভাঙন, অসম প্রতিযোগিতা, রাজনীতি-দল-পরিবার বাঁচানোর চাপ ইত্যাদির পরেও এই ভূমিধ্বস জয়ের পরে মমতা বন্দোপাধ্যায়কে উদ্দেশ্য করে বলতেই হয় –

কাল যেখানে পরাজয়ের
কালো সন্ধ্যা হয়,
আজ সেখানে নতুন করে
রৌদ্র লেখে জয়।

RELATED ARTICLES

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured