Homeএশিয়াইস্তাম্বুল খাল: ভূরাজনীতির নতুন ক্ষেত্র?

ইস্তাম্বুল খাল: ভূরাজনীতির নতুন ক্ষেত্র?

গত শনিবার (২৬/০৬/২১) তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান ইস্তাম্বুল খালের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। যা তার ড্রিম প্রজেক্ট হিসেবে খ্যাত। ৪৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ২৭৫ মিটার প্রস্থের এই খালটি কৃষ্ণ সাগর (Black Sea) ও মারমারা সাগরকে (Sea of Marmara) সংযুক্ত করবে। যার আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সম্ভাব্য নির্মাণকাল ধরা হয়েছে ৬ বছর।

চিত্র-১: ইস্তাম্বুল খালের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান।

ইস্তাম্বুল খাল খননের ধারণাটি একেবারে নতুন নয়। অটোম্যান সময়ে সুলতান সুলেমান (১৫২০-৬৬), সুলতান মুরাদ তৃতীয় (১৫৭৪-১৫৯৫), সুলতান মেহমেদ চতুর্থ (১৬৪৮-৮৭), সুলতান মাহমুদ দ্বিতীয় (১৮০৮-৩৯) প্রমুখ শাসকগণ ইস্তাম্বুল খাল খননের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু করলেও বিভিন্ন কারণে ওইসব প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। আধুনিককালে ১৯৯৪ সালে ডেমক্রেটিক লেফট পার্টির নেতা বুলেন্ত এচেভিত (Bulent Ecevit) পুনরায় ইস্তাম্বুল খালের ধারণাটি সামনে নিয়ে আসেন।

চিত্র-২: ইস্তাম্বুল খালের ভৌগলিক অবস্থান।

ইস্তাম্বুল খাল প্রকল্পকে বলা হয় এরদোগানের স্বপ্নের প্রকল্প। ২০১১ থেকেই এরদোগান “বিকল্প বসফরাস” তথা ইস্তাম্বুল খালের কথা বলে আসছেন। ২০১৮ সালে এসে এই খালের চূড়ান্ত রুট নির্ধারণ করা হয়। শুরু থেকেই তুরস্কের বিরোধী দল এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের দাবী, এর ফলে ইস্তাম্বুলে ভূমিকম্পের বেড়ে যেতে পারে এবং জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য হারিয়ে যেতে পারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে তুরস্ক কেন এত বড় একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে? এই বিকল্প বসফরাস পরাশক্তিগুলো কিভাবে দেখছে? নতুন এই খাল তুরস্কের কৌশলগত ভূরাজনীতিতে কেমন প্রভাব ফেলবে?

প্রথমেই আমাদের মনে রাখতে হবে তুরস্কের অবস্থান ইউরোপ ও এশিয়ার সন্ধিক্ষণে। দক্ষিণে ভূমধ্যসাগর, পশ্চিমে ইজিয়ান সাগর ও উত্তরে কৃষ্ণ সাগর এবং বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালীদ্বয় তুরস্কের সাথে বিশ্বের যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি তুরস্ককে পরিণত করেছে এশিয়া ও ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে। প্রতিবছর বসফরাস প্রণালী দিয়ে ৪৫ হাজার জাহাজ পারাপার করে, যা পৃথিবীর অন্যতম একটি ব্যস্ত নৌরুট। এত এত বাণিজ্য জাহাজ এই রুটে চলাচল করলেও তুরস্ক কোন রাজস্ব পায়না।

কিন্তু কেন?

১৯৩৬ সালের ২০ জুলাই তুরস্ক ,ব্রিটেন,ফ্রান্স, (তৎকালীন) সোভিয়েত ইউনিয়ন,জাপান, গ্রীস,রোমানিয়া,যুগোস্লাভিয়া বুলগেরিয়া ও অস্ট্রেলিয়া এই দেশগুলোর মাঝে বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালী নিয়ে মন্ট্রাক্স চুক্তি (Montreux Convention) স্বাক্ষরিত হয়। ৫ অধ্যায় ও ২৯ অনুচ্ছেদের এই চুক্তিতে অনেক গুলো যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী শান্তিকালীন সময়ে তুরস্ক বাণিজ্যিক জাহাজ গুলোর কাছ থেকে কোন প্রকার শুল্ক আদায় করতে পারবে না।  কৃষ্ণ সাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলো ৩০ হাজার টনের যুদ্ধজাহাজ এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে এবং কৃষ্ণসাগরে ২১ দিন পর্যন্ত অবস্থান‌ও করতে পারবে। আর অন্যান্য রাষ্ট্রের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টনের যুদ্ধজাহাজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালী দিয়ে পারাপার করতে পারবে। অন্যদিকে  যুদ্ধকালীন সময়ে তুরস্ক চাইলে প্রাণালীদ্বয় বন্ধ করে দিতে পারবে এবং কোন দেশ যদি তুরস্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় তাহলে সে দেশের বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে।

চিত্র-৩: দুই মহাদেশের মধ্যে যোগসাজশ স্থাপনের জন্য ঐতিহাসিক ও ভূকৌশলগত ভাবে ইস্তাম্বুল সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো এবং থাকবে।

এখন এই ইস্তাম্বুল খাল মন্ট্রাক্স চুক্তির আওতায় পড়বে কিনা এ নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইস্তাম্বুল খাল মন্ট্রাক্স চুক্তির অধীনে থাকবে না, এই খালে তুরস্কের সার্বভৌমত্ব বজায় থাকবে। যেহেতু বৈশ্বিক বাণিজ্য দিন দিন বাড়ছে সেইসাথে বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালীর উপর ক্রমান্বয়ে চাপ বাড়ছে। ফলে জাহাজগুলো ৪-৫ দিন সময় লাগে মারমারা সাগর থেকে কৃষ্ণ সাগরে পৌঁছতে। এমতাবস্থায় নতুন এই খাল যেমনিভাবে বসফরাসের উপর চাপ কমাবে তেমনি তুরস্কের রাজস্বের ক্ষেত্রে রাখবে বড় ভূমিকা।

ইতিমধ্যে আমরা জেনে এসেছি যে, মন্ট্রাক্স চুক্তির ফলে কৃষ্ণ সাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলো ৩০ হাজার টন পর্যন্ত যুদ্ধজাহাজ বসফরাস দিয়ে যাতায়াত করতে পারে এবং কৃষ্ণসাগরে ২১ দিন পর্যন্ত অবস্থান ও করতে পারে। কিন্তু অন্যান্য দেশের যুদ্ধজাহাজ ইচ্ছা করলেই কৃষ্ণ সাগরে আসতে পারে না। যার ফলে আমরা দেখি কৃষ্ণ সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর অবস্থান নেই। যা এই অঞ্চলের পরাশক্তি রাশিয়ার জন্য একটি স্বস্তির বিষয়। এখন এই নতুন খাল নির্মাণের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর জন্য কৃষ্ণ সাগরে পৌঁছতে আর কোন বাধা থাকবে না যদি না তুরস্ক ন্যাটোকে বাঁধা দেয়।

ভূরাজনৈতিক এই সমীকরণ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের কপালের ভাঁজ আরো দীর্ঘ করবে অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভবিষ্যতে সুফল বয়ে আনবে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। যদিও বিভিন্ন ইস্যুতে তুরস্ক- রাশিয়ার সম্পর্ক বর্তমানে ভালো কিন্তু রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। রাষ্ট্রগুলো সব সময় নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে নিজেদের পদক্ষেপ ঠিক করে। অপরদিকে নতুন এই খালের মাধ্যমে তুরস্ক তার অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নিজেকে পরাশক্তিগুলোর কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে এবং দরকষাকষির টেবিলে বাড়তি সুবিধা পাবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured