Homeইতিহাসএকত্রিকরণ পরিকল্পনা - পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যর্থ চক্রান্ত

একত্রিকরণ পরিকল্পনা – পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যর্থ চক্রান্ত

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত দুটি পৃথক রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ ভিত্তিক এ বিভাজনে, হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল হয় ভারতের অন্তর্ভূক্ত এবং মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। মজার ব্যাপার হলো, পাকিস্তান ভূখণ্ড নিজেই ছিল দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত, পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তান। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রায় সকল উপাদানকে আগ্রাহ্য করে, শুধু ধর্মীয় পরিচিতিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। অনুমিতভাবেই, দুই অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে জাতিগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বৈসাদৃশ্য জাতীয় সংহতির অন্তরায় হয়ে দাড়ায়। এছাড়াও, ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে পাকিস্তানের দুই অংশ শাসনে সৃষ্টি হয় নানাবিধ জটিলতা। প্রশাসনিক এসব বিপত্তি দূর করে চূড়ান্ত জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করতে প্রণয়ন করা হয় ‘এক ইউনিট ব্যবস্থা’।

‘এক ইউনিট ব্যবস্থা’ মূলত একটি ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনা যার প্রবক্তা ছিলেন জেনারেল আইয়ুব খান। ১৯৫৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলি বগুড়া পরিকল্পনাটির প্রস্তাব করেন। যা পরের বছর ১৪ অক্টোবর তাঁর স্থলাভিষিক্ত চৌধুরী মুহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে কার্যকর হয়। এই পরিকল্পনার আওতায় পূর্ব বাংলার বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানের তৎকালীন চারটি প্রদেশ- সিন্ধু, বালুচিস্তান, পাঞ্জাব এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশকে একীভূত করে একটি ইউনিট করা হয়, যার রাজধানী হয় লাহোর। সিলেট এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে অন্তর্ভূক্ত করে পূর্ব বাংলার নামকরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তান।

নেতৃবৃন্দের দাবি অনুসারে কয়েকটি বিশেষ উদ্দেশ্যে এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। যেমন, তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান সমস্যা প্রাদেশিক অসমতা কিংবা পক্ষপাতিত্বের অভিশাপ থেকে পাকিস্তানের অধিবাসীদেরকে নিষ্কৃতি দেয়া। দ্বিতীয়ত, বিচ্ছিন্ন অঞ্চল শাসনের ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত প্রাশাসনিক ব্যয় কমিয়ে আনা। তৃতীয়ত, পাকিস্তানের উভয় অংশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন। চতুর্থত, খুব সহজে পাকিস্তানের উভয় অংশের জনগণের জন্য কার্যকর শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা। সর্বোপরি, পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষা করা এবং জনগণের সর্বোচ্চ ঐক্য নিশ্চিত করা। প্রস্তাবকালে মোহাম্মদ আলি বগুড়া বলেন, “আর বাঙালি, পাঞ্জাবী, সিন্ধী, পাঠান, বালুচ, বাহওয়ালপুরী কিংবা খাইরপুরী বলতে কেউ থাকবে না। এই খণ্ডিত পরিচয়গুলির বিলোপ পাকিস্তানের অখন্ডতা শক্তিশালী করবে”।

যদিও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ‘এক ইউনিট ব্যবস্থা’র পক্ষে জনগণের সমর্থন লাভে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালান, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলোতে বিশেষ করে সিন্ধু প্রদেশে এর চরম বিরোধিতা করা হয়। রাজনীতিবিদদের সাথে এ বিরোধিতার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে ছাত্র, শিক্ষক, সুশীল সমাজ এবং নানাবিধ সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনও। তাদের আশঙ্কা ছিল, প্রশাসনিক এই সংস্কার অন্যান্য প্রদেশের অধিকার খর্ব করে এদের উপর পাঞ্জাবের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে। দ্বিতীয়ত, যদিও প্রচার করা হয়েছিল জাতীয় সংহতি নিশ্চিত করতে এই সংস্কার, আদতে তৃণমূল পর্যায়ের ভাষাগত বা জাতিগত বিতণ্ডা সুরাহায় তেমন কোন উদ্যোগই দৃশ্যমান হয়নি উক্ত পরিকল্পনায়। পশ্চিম পাকিস্তানের মতো পূর্ব পাকিস্তানেও বিরোধীতার মুখোমুখি হয় ‘এক ইউনিট ব্যবস্থা’। অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন পূর্ব বাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিকূলে পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসীদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রায়াস হিসেবেই গ্রহণ করা হয় এ পরিকল্পনা।

সর্বোপরি, এই পরিকল্পনা বিলোপের লক্ষ্যে শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলোতে ব্যাপক গণআন্দোলনের সূচনা হয়। পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিশেষ করে পাকিস্তান পিপলস্‌ পার্টি শেষদিকে এ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পূর্ব পাকিস্তানের গণঅভ্যুত্থান ও পশ্চিম পাকিস্তানের এ আন্দোলনে আইয়ুব খানের পতন ত্বরান্বিত হয়। উদ্ভূত পরিস্থিত নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পুনর্বহালে দুটি প্রধান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ১৯৬৯ সালে ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে নতুন সামরিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। প্রতিশ্রুতিগুলির মধ্যে ছিল, ‘এক ইউনিট ব্যবস্থা’ বাতিলকরণ এবং জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। অবশেষে, জেনারেল ইয়াহিয়া খান কর্তৃক “লিগাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার, ১৯৭০” জারির মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় দশকের ‘এক ইউনিট ব্যবস্থা’ বাতিল করে করে পূর্বতন প্রদেশসমূহ পুনর্বহাল করা হয়।

তথ্যসূত্রঃ

“Bangladesh the Unfinished Revolution”. Lawrence Lifschultz

“Formation of One Unit”. THE NEWS. July 26, 2015

 

RELATED ARTICLES

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured