Homeআন্তর্জাতিকএশিয়ার ন্যাটো কোয়াড এবং চীন - আমেরিকা টানাপোড়ন

এশিয়ার ন্যাটো কোয়াড এবং চীন – আমেরিকা টানাপোড়ন

ভূমিকা

অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে পরাশক্তি হয়ে ওঠা চীনকে ঘিরে ফেলতে বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেশটির প্রধান সঙ্গী হয়েছে ভারত। চীনকে নিয়ে পশ্চিমের ভয় নতুন নয়। একুশ শতকে চীন দর্পিত ভঙ্গিতে অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে যাত্রা শুরু করলে পশ্চিমের দেশগুলোর মধ্যে অস্বস্তি দেখা দিতে শুরু করে।তাদের মধ্যে এ রকম আশঙ্কা দেখা দেয় যে- এখন থেকেই পদক্ষেপ না নিলে প্রায় চার শতাব্দীজুড়ে বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের যে প্রতিপত্তি তা হয়ত অচিরেই শেষ হবে। তাই চীনকে কীভাবে বাধাগ্রস্ত করা যায়, তার এক সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা তখন থেকেই তারা হাতে নিয়েছিল।

জর্জ কেনানের ‘কনটেইনমেন্ট পলিসি ‘ সম্পর্কে আমরা সকলেই জানি,  মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা এ পলিসি অনুসারে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সব ধরনের কূটনৈতিক, সামরিক জোট গ্রহন করে দেশটির ক্ষমতা খর্ব করতে চেয়েছিলেন। দীর্ঘসময় ধরে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে এক ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে গিয়েছিল, যা ইতিহাসে স্নায়ুযুদ্ধ নামে চিহ্নিত আছে। সাম্প্রতিক কালে চীন অন্যতম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা মার্কিন স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করেছে। চীন মার্কিন দ্বন্দ্ব এখন নতুন দিকে টার্ন নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তাই ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে একটি নতুন জোট গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়েছে। একটি Asian NATO গড়ার কথাও কূটনৈতিক মহল থেকে উচ্চারিত হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ন্যাটো গঠন করা হয়েছিল, উদ্দেশ্য ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব কমানো। পশ্চিমা দেশগুলোকে নিয়ে ন্যাটো গঠিত হয়েছিল (১৯৪৯)। আজ নতুন আঙ্গিকে এশিয়ান ন্যাটোর কথা বলা হচ্ছে। এবার টার্গেট চীন। কোয়াড( QUAD) কেই যুক্তরাষ্ট্র ‘নয়া এশিয়ান ন্যাটোতে’ রুপান্তর করতে চায়।

চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোডের ‘পাল্টা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ও চেষ্টা করছে প্রতিনিয়ত ওয়াশিংটন। ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্বার্থ হুমকির মুখে পড়তেই মূলত এই নতুন খেলা কোয়াডের আবির্ভাব।

কোয়াড বা কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়লগ (QUAD) গঠিত হয়েছিল ২০০৭ সালে জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকা এই চারটি দেশ নিয়ে । বলা হচ্ছে এ অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য এ নতুন জোট। সর্বপ্রথম জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে তখন আনুষ্ঠানিক একটি চতুর্পাক্ষিক নিরাপত্তা আলোচনার ডাক দিয়েছিল। তবে এটি ২০০৭ সালে গঠিত হলেও সেভাবে সক্রিয় ছিল না। এটি কার্যকরভাবে কাজ করতে শুরু করে ২০১৭ সাল থেকে। এ সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক অগ্রযাত্রা প্রতিহত করা। যদিও প্রশান্ত মহাসাগরে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার কথা বলে এ সংগঠনটি যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই এদের লক্ষ্য চীন। বর্তমানে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আধিপত্য বিস্তারকে রুখে দেওয়া কোয়াডের মূল উদ্দেশ্য। অনেকেই কোয়াডকে সামরিক সংগঠন মনে করেন। বিশেষ করে কিছুদিন আগে যখন চীন বাংলাদেশকে কোয়াড সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে কোয়াড পুরোপুরি সামরিক সংগঠন হতে পারে নি এখনও। তবে এটিকে সামরিক সংগঠনে রুপ না দেওয়ার কারণ ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সংশয়। চীনের আশঙ্কা এটি খুব শীঘ্রই সামরিক সংগঠনে রুপ নিতে পারে। মূলত এ জন্যই চীন এ অঞ্চলে তাদের বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোকে  সাথে কোয়াড বিরোধী জোট গড়ে তোলার দিকে মনযোগী হয়েছে।

ইকোনমিক টাইমস অফ ইন্ডিয়ার সাংবাদিক দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী লিখেছেন যে এই সংস্থার উদ্দেশ্য এই অঞ্চলে গণচীনের আগ্রাসী ভঙ্গিমায় একটি “মুক্ত ও মুক্ত ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরকে” প্রচার করা। চীন-ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতার যথেষ্ট বৃদ্ধি ,  তাদের বিবাদমান সীমান্তে চল্লিশ বছরেরও বেশি সময়কালীন সংকট দ্বারা প্রভাবিত, যার ফলে তা ভারতকে কোয়াডে আরও বেশি নিযুক্ত এবং উৎসাহী অংশীদার করেছে।

কোয়াড সম্মেলন ও যৌথ মহড়া

২০২০ সালের মার্চ মাসে কোয়াড কর্মকর্তারা COVID-19 মহামারী নিয়ে আলোচনা করতে মিলিত হন , যেহেতু তা চীনের সৃষ্ট ভাইরাস । তারা প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভিয়েতনামের সাথে যোগ দিয়েছিল। ২০২০ সালের জুলাইয়ে অস্ট্রেলিয়াকে মালাবার ২০২০-তে সমন্বিত নৌ মহড়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে আলোচনা করা হয়, যা ২০২০ সালের শেষের দিকে নির্ধারিত হয় করোনভাইরাস প্যান্ডেমিকের কারণে। অস্ট্রেলিয়া সম্ভবত বেশিরভাগ নৌ অনুশীলনে যোগ দিতে পারে। ৬ অক্টোবর ২০২০, জাপানের টোকিওতে  কোয়াড এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন  অনু্ষ্ঠিত হয়। তারপর ভারত-আমেরিকা ২ প্লাস ২ বৈঠক বসেছিল নয়া দিল্লিতে ২৬-২৭ অক্টোবর। মালাবোর নৌ মহড়ায় ১৩ বছর বাদে অস্ট্রেলিয়ার যোগদান। ভারত বিগত বছরগুলোতে অস্ট্রেলিয়াকে নিতে অরাজি ছিলো। ২০০৭ সালের পর এই প্রথম। চীন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শন করায় জাপান ও আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি সংঘাত বেধেছে,  প্রাথমিকভাবে পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে। তাই চীনা সম্প্রসারণবাদী কর্মসূচি রুখতে ইন্দো- প্যাসিফিক অঞ্চলে আমেরিকা ও জাপান নিরাপত্তা পরি কাঠামো গড়ে তুলতে চায়। এজন্য শি-জিংপিংয়ের চীনের কাছে কোয়াড এখন পথের কাটা। কোভিড অতিমারী নিয়ে চীনের সাথে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্কে তিক্ততা তৈরী হয়। ভারত ও অস্ট্রেলিয়া কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও বাড়ায়।

কোয়াডভুক্ত দেশসমূহের সাথে চীনের বর্তমান সম্পর্ক

জাপানের সাথে চীনের সম্পর্ক দিনদিন অবনতি হচ্ছে। সেনকাকু আইল্যান্ড, তাইওয়ান হস্তক্ষেপ, এমনকি জাপানের সাথে মার্কিন সম্পর্কের উন্নতির ফলে চীনের সাথে জাপানের বৈরিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেনকাকু আইল্যান্ড যদিও জাপানের অধীনে রয়েছে কিন্তু চীনও এটিকে নিজেদের বলে দাবি করে। যার ফলে এটি নিয়ে দুদেশের মধ্যে সমস্যা রয়েছে।

তাছাড়া তাইওয়ান হস্তক্ষেপ নিয়েও জাপানের সাথে চীনের সম্পর্কে বৈরিতা রয়েছে। ১৯৭২ সালের আগে জাপান তাইওয়ানকে স্বাধীন -সার্বভৌম রাষ্ট্র বলে স্বীকৃত দিত। কিন্তু ১৯৭২ সালের পর থেকে জাপান তাইওয়ানের পরিবর্তে চীনকে স্বীকৃত জানাল এবং তাইওয়ানকে চীনের অংশ বলে অবিহিত করল। আবার গোপনে তাইওয়ানকে সাপোর্ট দিতে থাকে, যা চীনের জন্য এটি বড় মাথাব্যথা।

ভারতের সাথে চীনের সীমান্ত নিয়ে সমস্যা বহুদিনের। তাছাড়া উভয় দেশই এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গেছে। আবার পাকিস্তানের সাথে চীনের বন্ধুত্ব সম্পর্ক ভারতে সাথে বৈরিতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক রয়েছে নানা টানাপোড়েনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তি সময়ে ঘটে যাওয়া আমেরিকার দ্বারা প্রভাবিত প্রক্সিযুদ্ধ ( কোরিয়া যুদ্ধ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ),  চীনের সাথে মার্কিন সম্পর্কে বৈরিতা সৃষ্টি করেন। বর্তমানে উভয় দেশই বানিজ্য যুদ্ধে মেতে উঠেছে। হংকং, তাইওয়ান ও উইঘুর নিয়ে মার্কিনীদের হস্তক্ষেপ নিয়েও চীনের সাথে সম্পর্ক চরম অবনতি হয়েছে। তাছাড়া দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সাম্প্রতিককালে কোয়াড তথা এশিয়ান ন্যাটোর আবির্ভাব হয়েছে।

চীনের সাথে অস্ট্রেলিয়ার সংশয় দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় দুদেশের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিলো। ২০১৫ সালে চীন-অস্ট্রেলিয়া শুল্ক মুক্ত বানিজ্য শুরু হয়। অস্ট্রেলিয়ার দাবি চীন বানিজ্যের নামে দিনদিন চীনা গুপ্তচর বৃদ্ধি করে যাচ্ছে। তাছাড়া করোনা মহামারি দেখা যাওয়ার পর চীনের দেয়া পিপিই নকল প্রমানিত হলে বানিজ্যিক সম্পর্কে বৈরিতা সৃষ্টি হয়। তাছাড়া সাইবার হামলা, দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তার ও অস্ট্রেলিয়ার পার্শ্ববর্তী  দ্বীপ রাষ্টসমূহে চীনের অতিরিক্ত বিনিয়োগ, আধিপত্য বিস্তার ও মিলিটারি বেস স্থাপন পরিকল্পনা ইত্যাদি কারণে দুদেশের মধ্যেকার সুসম্পর্ক নষ্ট হয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured