Homeতত্ত্বকর্পোরেট দাসবৃত্তঃ কার্ল মার্ক্সের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির দৃষ্টিকোণ থেকে

কর্পোরেট দাসবৃত্তঃ কার্ল মার্ক্সের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির দৃষ্টিকোণ থেকে

[আমার লেখা পড়ে কর্পোরেট চাকুরিজীবী দের মধ্যে যদি কেউ মনে আঘাত পেয়ে থাকেন, আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। আপনারা অনেকেই passion এর কারণে এই কর্পোরেট চাকরি বেছে নিয়েছেন আর সেটাকে আমি শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আমাকে মারক্সবাদী ভাবার কোন কারণ নেই। কেননা আমি কার্ল মার্ক্সের (১৮১৮-১৮৮৩) মতবাদের অনেক কিছুর সাথেই একমত পোষণ করি না। তবে আমাদের দেশের চাকরির বাজারের ও কর্মক্ষেত্রের সত্যিকারের চিত্র অবলোকোন করার জন্য তাঁর Dialectical Method বা দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি আমার খুবই ভালো লেগেছে, তাই এখানে প্রকাশ করেছি মাত্র]  

আপনি ভার্সিটি থেক উচ্চসিজি প্রাপ্ত (সিজি ৩.০০ থেকে উচ্চসিজি ধরা হয়) ও আপনার কাজের পরিধিও বেশ ভালো। আপনি প্রেজেন্টেশনের জন্য স্লাইড বানানো থেকে শুরু করে ভিডিও এডিটিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন ইত্যাদি সবই পারেন। আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি,আপনার CV দেখে যে কেউ ঈর্ষান্বিত হতে বাধ্য। আর আপনার যে যোগ্যতা, আপনার জন্য চাকরির বাজারে স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান তো রীতিমতো তাদের অফিসের গেট খুলে বসে আছে স্বাগত জানানোর জন্য।

আপনি অফিসে জয়েন করলেন, নিজের জন্য আলাদা এসি রুম, পিয়ন, ওয়াইফাই ও ল্যান্ডলাইন টেলিফোন সংযোগ সবই পেয়েও গেলেন। সবই ঠিকঠাক মনে হচ্ছে আপনার। কিন্তু কিছু কিছু বিষয় আপনি কেমন জানি অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। যেখানে কর্পোরেট কোম্পানিগুলোতে এমপ্লয়িরা রাত ৮টার মধ্যে কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরে, আপনি সেখান থেকে রাত ১০টার আগে বেরই হতে পারছেন না। কোন একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রোজেক্ট আছে, সাথে ওভারটাইম কাজ করার জন্য এক্সট্রা স্যালারি! বসের এমন লোভনীয় আবার গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আমি কিংবা আমি কিভাবে ফেলতে পারি বলেন? আপনি তখন এই ওভারটাইম স্যালারি পাওয়ার লোভে রাত ২টা পর্যন্ত থাকতে বললেও থাকবেন! কিন্তু একাজ করতে গিয়ে আপনি নিজের পরিবারকে ও প্রিয়জনকে আপনার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত করেছেন, এটা একবার ও খেয়াল করেছেন?

দিন যাবে, মাস যাবে, বছর যাবে….. কিন্তু আপনার গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা প্রোজেক্ট শেষই হচ্ছে না। বরং, বস আপনাকে ওভারটাইম বোনাসের টোপ দিয়ে অনেক কাজই আদায় করিয়ে নিচ্ছেন। আবার, আপনার ন্যায্য ওভারটাইম স্যালারি থেকে বস আপনাকে নানান অজুহাতে বঞ্চিত করছেন। উনি মাঝে মাঝে বলবেন এটা হয়নি, ওটা হয়নি, এইটা কেন করলে ওটা করলে না বা ওটা কেন করলে এটা করলে না… অজুহাতের আর শেষই হয় না। মাই ডিয়ার, এতোদিন কামলা খেটেও যদি আপনার বোধদয় না হয় আপনি Corporate Slavery বা কর্পোরেট দাসবৃত্তির এর মতো একটি MOP (Mode of Production) এর অংশবিশেষ মাত্র, তার মানে বুঝতে হবে আপনি কোন দুনিয়ার বাসিন্দা!

কর্পোরেট দাসবৃত্তির প্রতীকী ছবি

আপনি যে এতো সুন্দর অফিসে চাকরি করনে… সবকিছু গোছানো ও ফিটফাট, সবাই খুবই নিয়মানুবর্তী এবং সময় অনুযায়ী কাজ করে, আবার কাজ শেষ হলে সুন্দরমতো বাড়ি ফিরে যায়। এগুলা আর কিছু না, একটা বাহ্যিক দৃশ্য মাত্র। একে Appearence বলে। এই Appearence এর ফাঁদ দিয়েই কিন্তু সেই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান আপনাকে হাতিয়ে নিয়ে Corporate Slave বানিয়েছে। এতোক্ষণ তো বাহিরের কথা বললাম, এখন ভিতরের কথাই না হয় বলি। অফিসের সবাই কম-বেশি অসন্তুষ্ট অফিসের বস ও গোটা প্রতিষ্ঠানের কাজ দেখে। কেউ আপনার মতো কামলা খেটে ন্যায্য ওভারটাইম স্যালারি পাচ্ছে না, কেই আবার যোগ্যতা থাকার পরও স্বজনপ্রিতির কারণে পদোন্নতি পাচ্ছেন না। আবার, খুব হতভাগা না হলে কেউ কেউ গত ২-৩ মাসের বেতন এখনও পাচ্ছেন না! কি আজব না? বাহিরে ফিটফাট কিন্তু ভিতরে সদরঘাট… একেই বলা হয় বাস্তবতা তথা Reality। আপনি যে এতো কষ্ট করে প্রোজেক্ট দাড় করাচ্ছেন, সেখানে তো আপনাকেই তো মূল্যায়িত করা উচিত। বরং, এখানে আপনার বদলে আপনার তৈরি প্রোজেক্টকে মূল্যায়িত করা হচ্ছে। কারণ আর কিছুই না, আপনার Intrinsic Value নাই, কিন্তু আপনার প্রোজেক্টের তা ঠিকই আছে। আর এই Appearance-Reality সহ পুরো প্রকৃয়াকে বলা হয় Dialectical Method বা দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি।

এখন আসা যাক আসল কাহিনীতে। আপনি অফিসে শুধু একা কামলা খাটেন না, আপনার মতো আরো কয়েকশো কর্মী এমনটা করে থাকেন। উলটা, আপনার বস ঠিকই আপনার ও আপনার সহকর্মীদের থেকে কাজ আদায় করে নিচ্ছে আর নিজের মাইনের টাকা গুনতে গুনতে বাসায় ফিরছে রাত ৮টার মধ্যে। আসলে এখানে দুই ধরণের উৎপাদন তথা প্রোডাকশন আছে। একটি হলো Forces of Production, যার মানে আপনি ও আপনার মতো যারা কামলা খাটে প্রোজেক্ট সম্পন্ন (উৎপাদন) করেন। আপনার ও আপনার বসের মধ্যকার যে শ্রেনী-বিবাদ (Class Struggle) বিদ্যমান রয়েছে আপনার প্রোজেক্টকে কেন্দ্র করে, এটাই হচ্ছে Relations of Production। অফিসের মালিক আপনার বস, আপনি যে আরামদায়ক এসি রুমে কাজ করেন সেটার মালিকও আপনার বস, আপনি যে ল্যাপটপে বা ডেস্কটপ কম্পউটারে আপনার মহামূল্যবান প্রোজেকেটের কাজের সমাধা করেন সেটার মালিকও আপনার বস। এক কথায়, অফিসে নিজের বলতে কিছুই নেই আপনার। সবই আপনার বসের। এমতবস্থায়, এই আপনার ও বসের মধ্যে শ্রেনী-বিবাদ (Class Conflict) এর ফলে যে জটিল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, এর পুরো প্রকৃয়া কে বলা হয় Mode of Production তথা MOP।

আবার MOP এর কিছু জিনিস না বললেই নয়। আমি এর আগেও বলেছি যে আপনি যে প্রোজেক্ট সমাধা করেছেন, তাতে আপনার কোন intrinsic value নেই। কিন্তু একটা জিনিস ঠিকই রয়েছে, আর সেটা হলো Surplus Value। আপনার কিন্তু যেখানে রাত ৮টা পর্যন্ত কাজ করলেই প্রোজেক্টের কাজ করা সম্ভব, বস কিন্তু ভুলিয়ে-ভালিয়ে ও নানান প্রলোভন দেখিয়ে আপনার থেকে আরো ২ ঘন্টা তথা রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। এখানে আপনার রাত ৮টা পর্যন্ত স্বাভাবিক কার্যক্রমকে Socially Required Working Time বলে, মানে আপনি যে টাকা মাইনে পান সেটা এই সময় কাজ করেই আসে। কিন্তু আপনি যে এক্সট্রা ২ ঘন্টা কাজ করেন, সেটার ওভারটাইম স্যালারি কিন্তু ঠিকই পাচ্ছেন না। বরং, সে সময়ে উপার্জিত টাকা চলে যাচ্ছে বসের পকেটে। একেই বলে Surplus Value। আদতে, আপনার বসের আয়ের মূল উৎসই হলো আপনার করা প্রোজেক্টের Surplus Value।

কালের বিবর্তনে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি

আপনি মনে হয় এতোক্ষণে আমার মাথাভারী করা কথা শুনার পর বিরক্ত বোধ করছেন নয়তো নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছেন এই ভেবে যে কি করে এই Corporate Slavery তথা কর্পোরেট দাসবৃত্তিতে নিজেকে জড়ালেন। চিন্তার কিছু নেই। আসলে এই কর্পোরেট দাসবৃত্তি নতুন কোন MOP না। এটা সেই আদিম কাল থেকে হয়ে আসছে। একেক সময় একেক রুপে ছিলো এটা। মানুষ যখনে আমাদের মতো নগরে বাস না করে বনে-জঙ্গলে বসবাস করতো, তখন এই ধরণের মালিক-কর্মচারী সম্পর্কের অস্তিত্বই ছিলো না। সকল বস্তু বা জিনিসে সবারই সমান অধিকার ছিলো। কিন্তু একটা সময় কিছু মানুষ সেই সকল জিনিসকে নিজেদের কাছে কুক্ষিগত করে রাখলো আর বাকী সবাইকে দাসী বানিয়ে ফেললো। এখান থেকেই আমরা এখন পর্যন্ত আপনার সো-কল্ড কর্পোরেট দাসবৃত্তির বিভিন্ন রুপ দেখতে পাই Primitive Slavery (আদিম দাসবৃত্তি তথা মালিক-দাস সম্পর্ক), Feudalism (সামন্তবাদ তথা জমিদার ও বর্গাচাষীদের সমপর্ক), Capitalism (পূঁজিবাদ তথা বুর্জোয়া-প্রেলেটারিয়াটদের মধ্যকার সম্পর্ক) এর মাঝে। আর বর্তমান জমানার বিভিন্নরুপের কর্পোরেট দাসবৃত্তির কথা নাহয় নাই বললাম। আসলে, আপনার ও আপনার বসের মধ্যে যে ধরণের MOP সম্পর্ক বিদ্যমান, তা হাজার হাজার বছর ধরে মানুষে-মানুষে রয়েছে। এটা নতুন কোন ঘটনা না। তাই, এই পুরো প্রকৃয়াকে Historical Materialism বা ঐতিহাসিক বস্তুবাদী বলা হয়। অর্থাৎ, বস্তুবাদী জিনিসটাই গোটা মানব-ইতিহাস ধরে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এটা কোনদিন থামবে না যতোদিন না নিপীড়িত মানুষ নিজের পঅধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার হবে এবং আপনার বসের মতো মানুষদের উৎখাত করবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured