Homeআন্তর্জাতিককাশ্মীর নিয়ে বিজেপির নয়া কূটকৌশল

কাশ্মীর নিয়ে বিজেপির নয়া কূটকৌশল

গত ২৪ জুন কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনে প্রায় সাড়ে ৩ ঘন্টার সর্বদলীয় যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে তাকে কেন্দ্রীয় সরকারের সাফল্য বলেই ধরা যায়৷ অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই বিষয়টি নিয়ে বেশ ভালোভাবেই আলোচনা সম্পন্ন করেছেন মোদি৷ পুরো আলোচনায় কোনরকম উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয় নি, বৈঠক ছেড়ে কোন নেতা চলে যান নি এবং সর্বোপরি বিষয়টি নিয়ে সেরকম  জল ঘোলা না করেই আলোচনা সম্পন্ন করতে পেরেছেন প্রধানমন্ত্রী।  মাত্র কিছুদিন আগেই এই কাশ্মীরী নেতাদের ‘গুপকর গ্যাং’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন তিনি৷ কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় কাশ্মীরী নেতাদের সাথে বৈঠকে বসতেই হলো তাকে৷

তিন বছর আগে ২০১৮ সালের জুন মাসে জম্মু ও কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় শাসন চালু হয়েছিলো৷ পরের বছর অর্থাৎ, ২০১৯-এ ৩৭০ ধারা বিলোপ করে মোদি সরকার।  জম্মু ও কাশ্মীরকে ভেঙে দুইটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা হয়। জম্মু – কাশ্মীর এবং লাদাখ। ৩৭০ ধারা বিলোপের ফলে জম্মু ও কাশ্মীরের যে  বিশেষ মর্যাদা ছিলো, তা হারাতে হয়৷

৩৭০ ধারা বাতিলের পর কাশ্মীরের সাবেক তিন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লা, মেহবুবা মুফতি এবং  ওমর আবদুল্লাকে দীর্ঘদিন ধরে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। এক বছর বন্দী রাখা নেতাদের সাথেই বৈঠকে বসেছিলেন মোদি, এটি বেশ উল্লেখযোগ্য একটি পরিবর্তন।  কাশ্মীরে মূলধারার রাজনীতি করা ১৪ জন নেতার সাথে বৈঠকে বেশ সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করেছেন মোদি৷

কাশ্মীরী নেতাদের সাথে হিসেবনিকেশে আসার কারণও রয়েছে বেশকিছু।

ভারতের উত্তর সীমান্তে ক্রমাগত চীনা আগ্রাসনের ফলে প্রায় ২ লক্ষ সেনা মোতায়েন করতে হয়েছে সীমান্ত এলাকায়।

এদিকে বাইডেন সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে নিজেদের সৈন্য সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।  কাজেই আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থান এবং তালেবানদের ক্ষমতা দখলেরও একটি সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে৷  পাকিস্তানের মদদপুষ্ট বলে পরিচিত তালেবানদের এই উত্থান এবং উত্তরে ক্রমাগত চীনের আগ্রাসন  ভারতের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বড় মাথা ব্যথার কারণ। এমতাবস্থায় কাশ্মীর নিয়ে ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না মোদি সরকার। তাই নিজেদের নীতির খানিকটা পরিবর্তন করতে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলটিকে৷ চীন এবং পাকিস্তান যাতে কাশ্মীর ইস্যুতে কোন সুবিধা নিতে না পারে,  তাই কাশ্মীরে স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি।

এ ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যস্থতায় ভারত-  পাকিস্তানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বেশ কিছুদিন আগেও আলোচনায় বসেছিলেন বলে খবর এসেছে৷ দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা প্রশমনই ছিলো মূলত আলোচনার লক্ষ্য।

কাশ্মীরী নেতারা মূলত ৫ টি দাবির কথা উত্থাপন করেছেন ।

১. পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা

২. বিধানসভার ভোটগ্রহণ

৩. পুরোনো অভিবাসন নীতি বহাল

৪. হিন্দু পণ্ডিতদের ফিরিয়ে আনা

৫. সব রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তিদান

কাশ্মীরী নেতারা অবিলম্বে নির্বাচন চাইলেও মোদি সরকার বলছে অন্য কথা৷ তারা আগে ডি লিমিটেশন করে পরে নির্বাচন দিতে চাইছে৷ কাশ্মীরী নেতারা এই ডি লিমিটেশনকে একটি শক্তিশালী সাম্প্রদায়িক বিভাজন হিসেবে দেখছেন৷ এই ডি লিমিটেশনের মাধ্যমে বিজেপি মূলত জম্মু কাশ্মীরের হিন্দু ও মুসলমান জনসংখ্যার অনুপাত বদলাতে চাচ্ছে৷ ২০১৯ সালের  আগস্ট পর্যন্ত ভারতের সংবিধানে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে ছিল জম্মু ও কাশ্মীর। কাশ্মীরের নিজস্ব সংবিধান থাকায় সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের কোন সুযোগ ছিলো না৷ সর্বশেষ কাশ্মীরের জনগণণা হয় ১৯৯১ সালে৷ ২০২৬ সাল পর্যন্ত রাজ্যে আর কোন সীমানা পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই বলে বিধানসভা আইনও জারী করেছিলো৷ কিন্তু কাশ্মীরের বিশেষ অধিকার কেড়ে নেয়ার পর এখন সেখানে ভিন্ন পরিস্থিতি বিরাজমান।

কাশ্মীর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও,  জম্মু মূলত হিন্দু অধ্যুষিত।  বিজেপি চাচ্ছে প্রায় সমান হিন্দু কাশ্মীরে প্রতিষ্ঠা করতে৷ অর্থাৎ বিজেপি কাশ্মীরকে আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাখতে চাইছে না৷ এই কাজটি করার মাধ্যমে বিজেপি মূলত ভোটের ফায়দা নিতে চায়৷ কাজেই এই ডি লিমিটেশনের  পরে ভোট গ্রহণের যে কেন্দ্রীয় তাগিদ তার ব্যাপারে কাশ্মীরের নেতাদের বেশ সংশয় রয়েছে৷

জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভার আসনের দিকে একবার তাকানো যাক৷ বিধানসভায় জম্মু-কাশ্মীরের আসন সংখ্যা ১১১ টি৷ এর মধ্যে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে আসন রয়েছে ২৪ টি৷ অর্থাৎ অখণ্ড রাজ্যের মোট আসন ৮৭ টি৷ লাদাখের ৪ টি আসন থাকলেও তা এখন একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল৷ কাজেই এই ৪ টি বাদে মোট ৮৩ টি আসনের মধ্যে কাশ্মীরে আছে ৪৬ টি এবং জম্মুতে ৩৭ টি৷ কাশ্মীরে আসন সংখ্যা বেশি হওয়ায় কাশ্মীরই মুখ্যমন্ত্রী নির্ধারণ করে। জম্মু-কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল অনুযায়ী বিধানসভায় আরও ৭ টি আসন বাড়ার কথা রয়েছে৷ কাশ্মীরের নেতারা ধারণা করছেন বিজেপি এই ৭ টি সিট জম্মুকে দিতে চায়,  যাতে করে রাজ্য শাসনে জম্মুর কতৃত্ব তৈরি হয়৷

মূলত এই কারণেই ডি লিমিটেশনের ব্যাপারে কাশ্মীরী নেতারা বিজেপিকে বিশ্বাস করতে পারছেনা৷  সম্প্রতি শেষ হওয়া বিধানসভা নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে  বেশকিছু রাজ্যে বিজেপির অবস্থা কিছুটা নড়বড়ে। কাজেই যে রাজ্যগুলোতে এখনও বিধানসভা নির্বাচন হয় নি,  সেগুলোতে জয় পেতে জোর প্রচেষ্টা চালাবে বিজেপি। কাজেই জম্মু কাশ্মীরে জয়ের জন্য রাজ্যের সীমানা নির্ধারণ তথা ডি লিমিটেশনের পথে হাটতে চাইছে কেন্দ্র সরকার।

সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদে জম্মু কাশ্মীরের যে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছিল, প্রত্যাহৃত হওয়ার পর কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার যে তা মোটেও ফিরিয়ে দেবে না, আলোচনার পর এই উপলব্ধি কাশ্মীরী নেতাদের হয়েছে। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লা সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘যারা ৭০ বছর ধরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের সুযোগ খুঁজেছে, অবশেষে সফল হয়েছে, তারা যে তা ফেরত দেবে না, তা সহজেই অনুমেয়।

এদিকে ৩৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে কাশ্মীরী নেতাদের মধ্যেও মতপার্থক্য স্পষ্ট।  কংগ্রেস ৩৭০ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের দাবি জানায়নি। তবে পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি ৩৭০ অনুচ্ছেদের পুনর্বহাল চান৷ যদিও কাশ্মীরি নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় জম্মু–কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন তথা সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল বিষয়ে তেমন কোনো আলোচনা  হয়নি, কারণ বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন।

তবে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, সরকার জম্মু–কাশ্মীরকে রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বৈঠক শেষে  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ টুইটও করেছেন,  বলেছেন পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে তাদের সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

২০১৯ সালে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর পাকিস্তান বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছিলো ভারতের উপর৷ ভারত জম্মু ও কাশ্মীরকে সাংবিধানিকভাবে দেওয়া স্বায়ত্তশাসন বাতিল এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করায় পাকিস্তান ভারতবিরোধী প্রচারণা চালিয়েছে। জাতিসংঘ এবং ইসলামি দেশগুলোর মাধ্যমে ভারতের উপর চাপ তৈরির চেষ্টা চালায় পাকিস্তান৷ শুধু তাই নয়, মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলে ২০০৮ সালের নভেম্বরের সন্ত্রাসী হামলা থেকে শুরু করে পাকিস্তানের বালাকোটে ২০১৯ সালে ভারতীয় বিমান হামলাসহ বেশ কিছু ঘটনার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এই অবস্থায় কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে আর সম্পর্ক খারাপ করতে চাইছে না ভারত৷  এছাড়াও আফগানিস্তানের বর্তমান  পরিস্থিতি, সেখানে পাকিস্তানের সমর্থনপুষ্ট  তালেবানের ক্ষমতায় যাওয়ার একটি  সম্ভাবনা, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রভাব—এসব বিষয় নিয়েও ভাবতে হচ্ছে ভারতকে৷

কাজেই বর্তমান পরিস্থিতিতে কাশ্মীরী নেতাদের সাথে মোদির এই বৈঠককে কেন্দ্রীয় সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত বলেই বিবেচনা করা যেতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured