Homeতত্ত্বকৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র: ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিস্তম্ভ

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র: ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিস্তম্ভ

ভূমিকা

কৌটিল্যের “অর্থশাস্ত্র”কে রাজনৈতিক শক্তিবাদ তত্ত্বের (Political Realism) অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন বলা হয়ে থাকে। যার অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “রাজনীতির বিজ্ঞান”। এই তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য হল একজন বিজ্ঞ রাজাকে রাজনৈতিক জ্ঞান ও কূটকৌশল প্রদর্শন করা, তিনি কিভাবে তার শত্রুদের পরাস্ত করবেন এবং সার্বজনীন মঙ্গলের জন্য শাসন করবেন।

কৌটিল্য ছিলেন রাজা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী। তিনি চাণক্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামেও পরিচিত ছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের শেষের দিকে গ্রীসের মেসিডোনিয়ার দিগবিজয়ী সম্প্রাট আলেকজান্ডার দ্যি গ্রেটের প্রবল আক্রমণের শিকার হয় ভারতের উত্তর-পশ্চিমাংশের ঐক্যহিন রাজ্যগুলো । প্রায়শই এসব ছোট ছোট রাজ্যগুলো নিজেদের মধ্যে কলহ-বিবাদ এবং যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিল। এই নৈরাজ্যকর পটভূমিতে কৌটিল্য রচনা করেন তার অর্থশাস্ত্র গ্রন্থ; যা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে প্রথম অবিভক্ত ভারতীয় সাম্রাজ্য গড়তে প্ররোচিত করে। তিনি মগধ রাজ্যের প্রবল প্রতাপশালী নন্দ রাজবংশকে পরাজিত করে, আলেকজান্ডারের অগ্রযাত্রাকে রুখে দিয়ে প্রথম অবিভক্ত ভারতের রাজা হিসেবে আবির্ভূত হন। যাই হোক, এখন আমরা কৌটিল্যের মূল তত্ত্বটাকে বোঝার চেষ্টা করবো। সেই সাথে বর্তমান ভারতের ওপর কৌটিল্যের নীতির প্রভাব তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

কৌটিল্য এবং অর্থশাস্ত্র

এই তত্ত্বে কৌটিল্যের চিন্তাধারার কেন্দ্রবিন্দু হল বিজিগীষু অর্থাৎ একজন দিগ্বিজয়ী শাসক যিনি নতুন নতুন রাজ্য দখলে নেবেন। আর কৌটিল্যের লক্ষ্য হল বিজিগীষুকে ‘চক্রবর্তি’ বানানো। চক্রবর্তি বলতে বোঝায় একজন বিশ্ব শাসক, যিনি রাজ্যগুলোর মধ্যে বিরাজমান চিরস্থায়ী দ্বন্দের অবসান ঘটাবেন এবং অপ্রতিরোধ্য এক সৈন্যদল তৈরি করবেন।

এখানে, বর্তমান ভারতকে কৌটিল্যের সেই দিগ্বিজয়ী শাসকের রাজ্য হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।  আর ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বিজিগীষু হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তাকে চক্রবর্তিন হতে গেলে কৌটিল্যের নির্দেশিত বিশ্বজয় করতে হবে। যার সীমানা হল ভারতের প্রাকৃতিক সীমানা, অর্থাৎ উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে ভারত মহাসাগর এবং আরব সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। যদি বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক পদক্ষেপ লক্ষ্য করি, তবে দেখবো এই অঞ্চলগুলোর দিকে ভারতের মনোযোগ অনেক বেশি।

অন্যান্য, বাস্তববাদী তাত্ত্বিকের মতো, কৌটিল্যও মনে করতেন, এই বিশ্ব নৈরাজ্যপূর্ণ। এখানে প্রত্যেক রাজ্য/রাষ্ট্র ক্ষমতা বিস্তারে এবং স্বার্থ উদ্ধারে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এই পরিস্থিতিতে নীতি-নৈতিকতা বা বাধ্যবাধকতা উপেক্ষিত। যদিও বা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জোট তৈরি হয়, তাতেও প্রত্যেকের নিজস্ব স্বার্থ জড়িত থাকে আর স্বার্থ শেষ হলে যেকোন সময় এই জোট ভেঙে যেতে পারে। এই অরাজক পরিস্থিতিকে কৌটিল্য বলেছেন ‘মাৎস্যন্যায়’। যার আক্ষরিক অর্থ দাড়ায় মাছের ন্যায়; যেখানে বড় মাছ ছোট ছোট মাছকে গিলে ফেলে। ঠিক একইভাবে নৈরাজ্যপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষমতাবানরা দূর্বলকে গ্রাস করবেই। এই মাৎস্যন্যায় পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে এবং বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে ভিজিগিসুকে চক্রবর্তিন হতে হবে। তাকে তার রাজ্য/রাষ্ট্রের অবস্থান বুঝতে হবে। এক্ষেত্রে ভিজিগিসু ও তার পার্শ্ববর্তি রাজ্যগুলোর অবস্থান সংশ্লিষ্ট যে ধারণা কৌটিল্য প্রদান করেন তা হল- ‘মন্ডল’ ব্যবস্থা

মন্ডল ব্যবস্থা

এই মন্ডল ব্যবস্থা অনেকটা ভৌগলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা। যা কতগুলো বৃত্তের চক্রকে বোঝায়। এই চক্রের কেন্দ্রে থাকবেন ভিজিগিসু। তার নিকটতম প্রতিবেশি রাষ্ট্রকে বলা হয় ‘অরি’ বা শক্তিশালী শত্রু রাষ্ট্র। তার পরবর্তি রাষ্ট্রকে বলা হয় ‘মিত্র’  অর্থাৎ বন্ধু রাষ্ট্র। এরপরের রাষ্ট্র হল ‘আরি মিত্র’  অর্থাৎ ভিজিগিসুর শত্রু রাষ্ট্রের বন্ধু এবং সেই সূত্রে এটি ভিজিগিসুরও শত্রু। মিত্র-মিত্র রাষ্ট্র হচ্ছে মিত্র রাষ্ট্রের মিত্র, সেক্ষেত্রে সেটি ভিজিগিসুর ও মিত্র। আবার অরি-অরি রাষ্ট্র ও আছে, যা শত্রু রাষ্ট্রের শত্রু। কৌটিল্যর বিখ্যাত উক্তি “শত্রুর শত্রু আমার মিত্র” বা “Enemy of my enemy is my friend” এই অরি-অরি রাষ্ট্রকেই কেন্দ্র করে। এছাড়াও আছে ‘মধ্যমা’ রাষ্ট্র; যেটি ভিজিগিসু অথবা তার আরি, যেকোন পক্ষেই থাকতে পারে। এই ধরণের রাষ্ট্রের প্রতি ভিজিগিসুর বিশেষ ধরণের সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। কারণ এরা ভিজিগিসুর দূর্বলতম মূহুর্তে আক্রমণ করতে পারে। উদাসীন রাষ্ট্রের কথাও বলেছেন কৌটিল্য; যেটি অনেক দূরবর্তি একটি রাষ্ট্র।

এই মন্ডল ব্যবস্থার আলোকে বর্তমান ভারতের অরি রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান, চীন, বাংলাদেশ, নেপাল, ভূটান, শ্রীলঙ্কা। আমরা লক্ষ্য করলে দেখবো, এই রাষ্ট্রগুলোর সাথে বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক, সামরিক, বাণিজ্যিক সংঘাত এর জন্মলগ্ন থেকেই লেগে আছে। আবার মিত্র রাষ্ট্র যদি বলি, তাহলে আফগানিস্তান, মায়ানমার, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা বলা যেতে পারে।

মন্ডলা ব্যবস্থার সাফল্য অর্জনের জন্য কৌটিল্য ছয়টি নীতির কথা উল্লেখ করেছেন। একে “সাদ্গুনিয়া” বা কূটনীতির ছয় কৌশল বলা হয়। এগুলো হলঃ

১.সন্ধি: সন্ধি বা শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত দূর্বলতম পক্ষকে শক্তিশালী পক্ষের সাথে শান্তিচুক্তি করতে হবে।

২. বিগ্রহ: অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী পক্ষ বিগ্রহ বা যুদ্ধের সূচনা করবে।

৩.আসন: যে পক্ষ মনে করবে, শত্রুপক্ষ তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না এবং শত্রুর ধ্বংস  সাধনের যথেষ্ঠ সক্ষমতা তার রয়েছে, সে আসন বা নিরপেক্ষতা অবলম্বন করবে।

৪.যান: যখন সমস্ত প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে, তখন শত্রুর বিরুদ্ধে অগ্রগমন করতে হবে।

৫.সংশ্রয়: শাসক যখন মনে করবেন, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার মতো সক্ষমতা তার নেই, তখন তিনি অন্য রাষ্ট্রের সাথে জোট গঠন করবেন।

৬.দ্বৈধীভাব: এক্ষেত্রে দুই পক্ষের সাথে একই সময়ে যুদ্ধ না করে, একপক্ষের সাথে আপাতত      শান্তিচুক্তি করে অপরপক্ষের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

কৌটিল্য শুধু এই কূটনীতির কৌশলগুলো বলেই ক্ষান্ত হননি। কৌশলগুলো বাস্তবায়নের উপায়ও বলে দিয়েছে। উপায়গুলো হলঃ

১.সাম্য: শাসক যখন দেখবেন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে তার বিজয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ, তখন তিনি               আপোষ করবেন।

২.দান: এ প্রক্রিয়ায় উপহার ও উৎকোচ প্রদান করতে হবে প্রতিপক্ষের রাজা, জনগণ, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গেকে। দূর্বলতম রাজা, লোভী রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গ কিংবা অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠীকে এই প্রক্রিয়ায় হস্তগত করতে হবে। আর তারাই বিনারক্তপাতে ভিজিগীসুর জয়কে ত্বরাণিত করবে।

৩.ভেদ: দান ব্যর্থ হলে ধীরে ধীরে সেই রাষ্ট্রের রাজা/সরকার ও জনগণের মাঝে বিভক্তির বীজ বপন করে ভেদাভেদ সৃষ্টি করতে হবে। সেক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্ত একটা রাষ্ট্র দখল করা অথবা দমিয়ে রাখা তুলনামূলক সহজ কাজ।

৪.দন্ড: উপরের সমস্ত উপায় ব্যর্থ হলে শাসককে প্রকাশ্য আক্রমণ বা যুদ্ধে জড়াতে হবে। যুদ্ধ যেহেতু একটি চরম সিদ্ধান্ত, তাই এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের আর্থিক অবস্থা এবং জনপ্রিয়তার দিকটি বিবেচনায় রাখতে হবে। ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ এবং জনবিচ্ছিন্ন শাসকের পতন ঘটানো তুলনামূলক সহজসাধ্য হবে।

এই পর্যন্ত কৌটিল্যের কূটনৈতিক কৌশল ও তা অর্জনের নানাদিক দেখলাম। এখন এর আলোকে তুলে ধরবো ভারতের নেওয়া নানা রাজনৈতিক কার্যকলাপ এবং প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে কৌটিল্যের প্রভাব

১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন দেশ হিসেবে অস্তিত্ব লাভ করলেও স্থানীয় কিছু রাজ্য স্থানীয় শাসকদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার সুযোগ পায়। হায়দ্রাবাদ ছিল তার অন্যতম, এটি নিজাম শাসিত রাজ্য ছিল। ভারত এক্ষেত্রে ‘ভেদ’ এর মাধ্যমে এই রাজ্যে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ সৃষ্টি করে এবং ক্রমাগত ভারতীয় গণমাধ্যমে হিন্দু নির্যাতনের বিষয়কে চিত্রায়িত করতে থাকে। ফলে হায়দ্রাবাদ আক্রমণের জন্য নিজ দেশে জনসমর্থন গড়ে তুলতে সক্ষম হয় তারা। ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের সেনাবাহিনী হায়দ্রাবাদ আক্রমণ করে। সুসজ্জিত ভারতীয় বাহিনীর কাছে  টিকতে না পেরে নিজামের বাহিনী ১৭ সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পণ করে। এভাবেই হায়দ্রাবাদকে ভারতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কৌটিল্যের নীতি বাস্তবায়নের আরেকটি জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হল সিকিম। এই রাজ্যটি চীনকে চাপে রাখতে ভূকৌশলগত কারণে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়ায়। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ সিকিম প্রজেক্ট হাতে নিয়ে মাঠে নামে। লেন্দুপ দর্জি এবং সিকিমের রাজবংশের মধ্যবর্তি শত্রুতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তারা। লেন্দুপ দর্জিকে সিকিমের ক্ষমতার জন্য প্রলুব্দ করে সিকিমের অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরি করে ‘র’। অবশেষে ১৯৭৫ সালের ৬ এপ্রিল ভারতীয় সেনাবাহিনী সিকিমের  রাজা চোগিয়াল পালডেনকে বন্দি করে এবং এভাবেই স্বাধীন সিকিম ভারতের ২২তম প্রদেশে পরিণত হয়।

ভারত-পাকিস্তানের শত্রুতার ইতিহাস নতুন করে বলার কিছু নেই। স্বাধীনতার পরপরই দেশ দুটি কাশ্মীরকে নিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তিতেও বেশকিছু বড় ধরণের যুদ্ধে জড়ায়। ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম হয়। এখানে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যবর্তি অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে ভারত সেখানকার যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে এবং শেষভাগে নিজের সেনাবাহিনীকে যুদ্ধে প্রেরণ করে। ফলস্বরূপ পাকিস্তান তার পূর্বাংশে ভূখন্ড হারায়, যা ছিল পাকিস্তানের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ভারতের বড় সাফল্য ছিল।

লাদাখ নিয়ে চীন-ভারত সাম্প্রতিক উত্তেজনা আমরা লক্ষ্য করেছি। এর আগে ১৯৬২ সালের যুদ্ধে ভারতের শোচনীয় পরাজয় ভারতকে এই আরির ব্যাপারে অন্যভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করে। তাকে সন্ধির আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

পাকিস্তান ও চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভারত আফগানিস্তানকে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় ভারত সেখানে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে। আফগান পার্লামেন্ট ভবন নির্মাণ, ইরান সীমান্তের নিকটবর্তি ২১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণ, সালমা বাঁধ নির্মাণের মতো কর্মকান্ডের মাধ্যমে আফগানিস্তানে ভারত তার একটা প্রভাব বলয় তৈরি করে। কাবুল, হেরাত, জালালাবাদ, মাজার-ই-শরীফ ও কান্দাহারে কনস্যুলেট খুলে, সেখান থেকে ভারতীয় ‘র’ পাকিস্তান ভাঙার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে থাকে। বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ দিতো ও অপারেশনের তদারকি করতো তারা। এছাড়াও চীন-পাকিস্তানের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রজেক্ট ক্ষতিগ্রস্থ করার মাধ্যমে তার এই দুই শত্রু রাষ্ট্রের সম্পর্কে চিড় ধরানোর কাজ করে গেছে। পাশাপাশি ইস্ট তুর্কিস্তান ইন্ডিপেনডেন্ট মুভমেন্ট নামে একটি সংগঠন গড়ে চীনের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কাজ করে যাচ্ছিল তারা। কিন্তু তালিবানের হাতে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ আসায় ভারত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কার মতো ছোট দেশগুলোতে ভারতের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব লক্ষণীয়। স্বাধীনতার পরেও একটা সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী অবস্থান করে। ১৯৭২ সালে একটি ২৫ বছর মেয়াদী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি নামে পরিচিত। অনেকেই মনে করেন এটি ভারতীয় আধিপত্য বাংলাদেশের ওপর চাপানোর একটি চুক্তি, যা কার্যত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে হুমকি প্রশমনের জন্য করা। অভিন্ন নদীর পানি বন্টন, বাংলাদেশে ভারত তাদের পণ্যনির্ভর হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে ক্রমশই চাপে রাখছে দেশটিকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র-প্রশিক্ষণ দিয়ে সেই অঞ্চলের সহিংসতাকে উসকে দিতে ভারতের ভূমিকা অনেক সময়ই প্রকাশ্যে এসেছে।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মায়ানমারের সাথে ভারতের মিত্রতা রয়েছে। অতি সম্প্রতি ভারত মায়ানমারকে একটি সাবমেরিন দিয়েছে। এটা যে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশকে চাপে রাখতে দেওয়া হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়।

নেপালের অর্থনীতি অনেকাংশেই ভারত নির্ভর। এমনকি নেপালি মুদ্রার পাশাপাশি দেশটিতে ভারতীয় মুদ্রাও চালু রয়েছে। যদিও ক্রমেই বৈরিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় ভারতের দ্বিমুখীনীতি লক্ষণীয়। কখনো তামিলনাড়ু রাজ্যের পক্ষ নিয়ে তারা এলটিটিইকে সহযোগীতা করেছে, আবার একইসাথে শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনীকে অস্ত্র-প্রশিক্ষন দিয়েছে। যা ক্রমেই দেশটিকে অস্থিতিশীল করে তোলে।

এভাবেই যুদ্ধ ছাড়া ভারত চাণক্য/কৌটিল্যের কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোকে নিজস্ব বলয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ভারতের যুদ্ধংদেহী নীতির ফলে ক্রমশই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস-অনাস্থা বাড়ছে। আর চীনের উত্থান এবং দেশগুলোতে চীনের বিশাল বিনিয়োগ ক্রমেই তাদের চীনমুখী করে তুলছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সমর্থনের ঘটনাগুলো বরাবরই সমালোচিত। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা থেকে ভারত ক্রমেই তার প্রভাব হারাচ্ছে। ভূরাজনৈতিক সমীকরণে আয়তনে ছোট দেশগুলো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কৌটিল্যের নীতির পূর্ণ প্রয়োগ কতটা কার্যকর সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

RELATED ARTICLES

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured