Homeতত্ত্বগেইম থিওরির আলোকে বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত সমস্যা

গেইম থিওরির আলোকে বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত সমস্যা

আন্তর্জাতিক সম্পর্কে Game Theory এর চমৎকার একটি উদাহরণ হচ্ছে Prisoners’ Dilemma। এই থিওরিতে মূলত দেখানোর চেষ্টা করা হয় কিভাবে দুইটা Actor এর মাঝে নিজেদের স্বার্থে সহযোগিতা (Cooperation) ভীষণ ভাবে দরকার হয়। এক্ষেত্রে দুইজন বন্দীর মাঝে একটি কাল্পনিক গেইম খেলা হয় এবং দেখানোর চেষ্টা করা হয় কিভাবে দুইটি দেশের মাঝে সহযোগীতা আবশ্যক। সেই কাল্পনিক দৃশ্যকল্পে ধরে নেয়া হয় দুইজন বন্দী পৃথক দুইটি রুমে থাকবে এবং তাদের মাঝে কোনো যোগাযোগ থাকবে না। এবং তাদের প্রত্যেককেই জিজ্ঞাসা করা হবে যে তারা দোষী কিনা। এক্ষেত্রে কয়েকটি অবস্থা হতে পারে;


১) যদি বন্দীদের মাঝে কেউ তাদের দোষ স্বীকার না করে তাহলে কারো শাস্তি হবেনা

২) যদি উভয়ে স্বীকার করে তাহলে উভয়ের কিছু শাস্তি হবে

৩) যদি একজন দোষ স্বীকার করে আর অন্যজন স্বীকার না করে তাহলে উভয়ের শাস্তি হবে।

চিত্র-১ঃ বিশ্বখ্যাত প্রিজনার্স ডিলেমা’র লেখচিত্র

 

এটা গেল থিওরির মূল কনসেপ্ট। এখন আমরা এই থিওরি বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত হত্যার সাথে মিলানোর করার চেষ্টা করব।

ধরে নিলাম সীমান্ত হত্যা (Border Killing) নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝে উত্তেজনা সৃষ্টি হলো। তখন বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে মোটাদাগে তিনটি অপশন থাকবে

১. উভয়ে সংঘাতে (Conflict) জড়িয়ে পড়বে।
২. একজন  সংঘাতে  যাবে অন্যজন যাবেনা।
৩. কেউই সংঘাতে না গিয়ে আপস- আলোচনার (Corporation/Mutual Negotiation) মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করবে।

প্রথম অবস্থা: উভয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে

এই অবস্থা উভয়ের জন্যই বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করবে। উভয় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নিরাপত্তা, জাতিসংঘ কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা, মধ্যস্থতার জন্য অন্য দেশের হস্তক্ষেপ ইত্যাদির আশঙ্কা থাকবে এবং উভয়ের ক্ষতি নিশ্চিত। তার মানে যদি উভয় দেশ এই ইস্যুতে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে তাহলে তা উভয়ের জন্যই ক্ষতির কারণ হবে।

বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করা যাক।

যদি বাংলাদেশ-ভারতের মাঝে সংঘাত শুরু হয় তাহলে ভারতের অন্যান্য ক্ষতির ভৌগোলিকভাবে (Geopolitically) খুবই গুরুত্বপূর্ণ “সেভেন সিস্টারস” অর্থাৎ ভারতের উত্তর-পূর্ব সাতটি প্রদেশ ভারত থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ভয় থাকবে। ৪১ কিলোমিটার আয়তনের শিলিগুড়ি করিডোর (“চিকেন’স নেক” নামেও পরিচিত) যা ভারতের সেই সাতটি রাজ্যর মাঝে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এই জায়গাটার দিকে চীনের নজর অনেক দিনের। যদি কোনো সংঘাত সৃষ্টি হয় তাহলে চীন দ্বিতীয় বার চিন্তা না করে এই জায়গা দখলে নিতে দ্বিতীয়বার ভাববে না। যার ফলে স্বাধীনতাকামী সাতটি রাজ্য ভারতের কেন্দ্রের সাথে আর কোন সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা স্বাধীন হয়ে যাবে।
অপরদিকে বাংলাদেশ যেহেতু তুলনামূলকভাবে ভারত থেকে খুবই ছোট একটি রাষ্ট্র এবং তিন দিকে ভারতে অবস্থিত তাই যদি সংঘাত হয় তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি ভয়াবহতা নিয়ে আসবে।
অর্থাৎ প্রথম অবস্থায় দুই পক্ষেরই ক্ষতির আশঙ্কা আছে।

দ্বিতীয় অবস্থা: একজন সংঘাতে যাবে অন্যজন যাবে না

দ্বিতীয় অবস্থায় যদি একজন কনফ্লিক্টে যায় আর অন্যজন না যায় তাহলে সাময়িকভাবে হয়তো সংঘাত বন্ধ থাকবে কিন্তু এটা লং টাইমের জন্য সমাধান নয়। এক্ষেত্রে যে দেশ কনফ্লিক্টে যাচ্ছে তার উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। তদুপরি যে দেশ বর্তমানে সংঘাতে যাচ্ছে না ভবিষ্যতেও সংঘাতে যাবে না এমন নিশ্চয়তা নেই। পরিবেশ-পরিস্থিতি ও ক্ষমতার পরিবর্তন হলে যে দেশ বর্তমানে সংঘাতে যাচ্ছে না তারাও সংঘাতে যেতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারত দিন দিন বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে। নেপাল, ভূটান ও শ্রীলংকা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপকে আর ভালো চোখে দেখছে না। একটা সময় ছিল যখন ভারত ঐ দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করত কিন্তু এখন ক্ষমতার পালাবদলের কারণে ভারত সরকার না সেই প্রতিবেশী দেশগুলোর মানুষের সমর্থন পাচ্ছে না ওই দেশের সরকারগুলোর আস্থা অর্জন করতে পারছে। এমন অবস্থা যে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও হবে না তার নিশ্চয়তা কি?

ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে ভারতের নাম জড়িত এবং ১৯৭১ এ ভারতের  অবদানের কথা আজও আমরা আকণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করি। কিন্তু ভারত যদি সীমান্ত হত্যা বন্ধ না করে, অসম বাণিজ্য রীতি চালু রাখে, আন্তর্জাতিক নদীগুলোতে বাঁধ দেয়, কারণে-অকারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য গুলোর চালান বন্ধ করে দেয় তাহলে বাংলাদেশ হয়ত নিজের স্বার্থে ও realpolitik এর বিবেচনায় সাময়িক নিরবতার কৌশল নেবে কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের দিকে ঝুঁকে পড়বে না এটা কি হলফ করে বলে দেয়া যায়?

তৃতীয় অবস্থা: কেউ সংঘাতে না গিয়ে আপস- আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করবে

এই অবস্থা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক এবং এতে কারো কোন ক্ষতির আশঙ্কা থাকবেনা এবং সমস্যার সমাধান হবে।
বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশ ধীরে ধীরে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। নিজ দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। উভয় দেশেরই জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ঊর্ধ্বমুখী। এমতাবস্থায় যে কোন প্রকারের যুদ্ধ উভয় দেশের জন্যই ক্ষতির কারণ হবে। কেননা যুদ্ধ মানেই  Zero Sum Game।

উপরোক্ত তিনটি অবস্থা বিবেচনা করে আমরা বুঝতে পারি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারস্পরিক সহযোগিতার (Cooperation) গুরুত্ব ও আবশ্যকতা।

শেষ কথা: এই থিওরির মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি why cooperation is highly needed in the international arena.

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured