Homeবাংলাদেশজলবায়ু পরিবর্তনে প্রকৃতির মহা বিপর্যয়

জলবায়ু পরিবর্তনে প্রকৃতির মহা বিপর্যয়

আমাদের চারপাশে প্রকৃতির অবাধ বিচরণ। মহান আল্লাহ আমাদের চারপাশের জগতকে তার নিজ হাতের নৈপুণ্যে সাজিয়েছেন, প্রকৃতিতে দিয়েছেন অনন্য সব উপাদান যা আমাদের মুগ্ধ, বিমোহিত করে আসছে পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত। পৃথিবীর প্রকৃতিতে রয়েছে ভিন্নতা। প্রতিটি দেশে প্রত্যক অঞ্চলে প্রকৃতির উপাদানে ভিন্নতা রয়েছে, রয়েছে বৈচিত্র্যতা। আমাদের জীবন ধারণের উপকরণগুলো আমরা প্রকৃতি থেকে পেয়ে থাকি । প্রকৃতি আমাদের এত কিছু দিয়ে আসতেছে কিন্তু আমরা তার বিনিময়ে প্রকৃতিকে কিছুই দিতে পারিনি! অপরদিকে প্রকৃতির যত্ন নেওয়াতো দূরের কথা আমরা কেবল প্রকৃতিকে ধবংস করেই চলেছি। যার কারণে প্রকৃতি এখন আমাদের সাথে বিরুপ আচরণ করছে।
বিগত বছরগুলোতে বিশ্ব কয়েকটি বড় ধরণের প্রাকৃতিক দূর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়েও পরিবেশ হুমকির মধ্যে রয়েছে এই বড় ধরণের প্রাকৃতিক দূর্যোগগুলো সংঘটিত হওয়ার কারণে। বর্তমান পৃথিবীতে ক্রমাগত নগরায়ন, শিল্পায়নের কারণে বিশ্বে পরিবেশ দূষণের মাত্রা সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পৃথিবীর উন্নতদেশ গুলো তাদের শিল্পের রাসায়নিক বর্জ্য , পারমাণবিক বোমার তৈরির বর্জ্য সমুদ্রে নিক্ষেপ করায় পরিবেশগত ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। উন্নত রাষ্ট্রগুলোর নিক্ষেপিত বর্জ্য এবং অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের কারণে বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিবেশ দূষণ এবং ভৌগোলিক অবস্থানগত পরিবেশে বিরুপ প্রভাব পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকার বনাঞ্চলের দাবানলের ভয়াবহ রুপ দেখছে বিশ্ব। এই ভয়াবহ দাবানলের কারণে পৃথিবীর ফুসফুস ‘আমাজন’ বনের হেক্টরের পর হেক্টরের জমির বনভূমি যেটিতে হাজার হাজার বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে সেগুলোও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, ৫০লাখ বন্যপ্রাণী মারা গেছে, বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীগুলো হুমকির মধ্যে পড়েছে, হাজার হাজার একর জনবসতি পুড়ে গেছে, আমাজন বনের বাস্তুতন্ত্রে বিরুপ প্রভাব পড়েছে। সৃষ্ট দাবানলের কারণে বাতাসে বিষাক্ত ধোয়া ছড়িয়ে পড়েছে এবং আমাজন বনের বন্যপ্রাণীদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।আমাজন বনে বসবাসরত উপজাতিদের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে তাদের পেশাগত কারণে।
প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে প্রশান্ত মহাসাগরের ভৌগোলিক অবস্থান পরিবর্তন হচ্ছে। মহাসাগরের তলদেশ থেকে যে ভূমিকম্প গুলো সৃষ্টি হবে যা আঘাত হানতে পারে আগামী কয়েকবছরের মধ্যে।মহাসাগরগুলোর তলদেশে বসবাসরত জলজ উদ্ভিদ, প্রাণী বিপন্ন অবস্থায় জীবন অতিবাহিত করছে। বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী, নীল তিমি, হাঙ্গর, অক্টোপাসসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মৎস, শৈবালের জীবনচক্র সংকটে রয়েছে।
আমেরিকা উপকূল, জাপান উপকূল এবং ভারত মহাসাগরীয় উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবের কারণে জনবসতি হারানোসহ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মানুষ। ভারত মহাসাগরের উপকূলে বসবাসরত জনবসতি এবং বঙ্গোপসাগর উপকূলে বসবাসরত উপকূলীয় মানুষের জীবিকা ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, পেশা বদলে যাচ্ছে, এলাকার সাংস্কৃতিক পরিবেশ, ভৌগোলিক পরিবেশে তারতম্য ঘটছে প্রতিনিয়ত। বাস্তুহারা হচ্ছে কোটি কোটি মানুষ।মানুষের স্থানান্তরের কারণে উৎবাস্তু মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘ শরনার্থী বিষয়ক সংস্থা জানিয়ে যে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলে বাস্তুচুত্য হয় ২কোটি মানুষ। বাস্তুচুত্য মানুষগুলো স্থানান্তরের কারণে বিশ্বের বর্ডারগুলোতে শরনার্থীদের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন। মানবপাচার বেড়ে যাচ্ছে এবং ভূমধ্যসাগর সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার সময় নৌদূর্ঘটনা ঘটছে। বিগত বছরগুলোতে এই নৌদূর্ঘটনায় বাংলাদেশিসহ ৫০০০এর অধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে জলবায়ুগত পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব দেখা গেছে ।জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকার মানুষের পেশা বদলে গেছে, রাজধানীতে বস্তির সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুনের চেয়েও বেশী। বস্তিতে বসবাসরত মানুষেরা পর্যাপ্ত শিক্ষার পরিবেশ না পাওয়ায় বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছেনা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে যে প্রাকৃতিক দূর্যোগটি সবচেয়ে বেশী ঘটে তা হচ্ছে বন্যা। যার কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশের আবাদি জমি, রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্থ হয়, বিপুল টাকার সম্পদ নষ্ট হয়। ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন ইত্যাদির প্রভাবে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কমে এসেছে ,ইকোসিস্টেমে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে যা জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে দাড়াচ্ছে। বন্যপ্রাণীগুলো তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে এবং অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে যা বাংলাদেশের জলবায়ু ও পরিবেশের জন্য হুমকি স্বরুপ।
এ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য এখনই কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে নয়ত আগামী শতাব্দী নাগাদ বিশ্বে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি হবে । ইতিমধ্যে এন্টার্টিকা মহাদেশের বরফ গলতে শুরু করেছে এবং এ বছর এই মহাদেশের বরফ গলার পরিমাণ কোটি কিউসেকের চেয়েও বেশী। এছাড়াও আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোতে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং খাদ্য উৎপাদন কমে গেছে। বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রমে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করেছেন যে,আগামী কয়েকবছরে বন্যপ্রাণীর ৭০শতাংশ প্রজাতি কমে যাবে।তাই আমাদের এই পৃথিবীকে বাচাতে  আমাদের এখনই প্রয়োজন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুসারে আমাদের উন্নত দেশগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।প্যারিস জলবায়ু চুক্তিকে “ঐতিহাসিক অর্জন ” বলে আখ্যায়িত করা হয়।বিশ্বের দুইশোটির ও দেশ এই চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার অঙগীকার করে।১৯৯৭সালের কিয়োটো প্রটোকল চুক্তিতে গোটা কয়েক গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল তা বাস্তবায়িত হয়নি তার ফল স্বরুপ প্যারিস জলবায়ু পরিবর্তন চুক্তি ২০১৫ সালে স্বাক্ষর করা হয়। চুক্তিতে যে পদক্ষেপগুলোর কথা বলা হয়েছে তা নিম্নরুপঃ
১. বৈশ্বিক উষতা বৃদ্ধি ২ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে আনা।
২. প্রতি ৫বছর অন্তর গ্রিণহাউস গ্যাসের মাত্রা কমিয়ে আনতে দেশগুলোর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা করা।
৩. জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়া এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গরীব দেশগুলোর জন্য “জলবায়ু তহবিল” গঠন করা।
৪. গাছ,মাটি ও সমুদ্র প্রাকৃতিকভাবে কার্বন শোষণ করতে পারে তা ২০৫০সাল থেকে ২১০০সালের মধ্যে কৃত্রিমভাবে কমিয়ে আনা।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured