Homeআন্তর্জাতিকজো বাইডেনের চ্যালেঞ্জসমূহঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অদূর ভবিষ্যৎ

জো বাইডেনের চ্যালেঞ্জসমূহঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অদূর ভবিষ্যৎ

২০২০ সালে অনুষ্ঠিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৪৪ বছরের ইতিহাসে ৫৯তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সর্বজেষ্ঠ্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ডেমোক্রেট দলের জো বাইডেন হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর বর্তমান রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে জো বাইডেনই আগামী ২০শে জানুয়ারি ২০২১ সালে ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিবেন হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে।

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে পরাশক্তি হিসেবে রাশিয়া ও চীনের উত্থান এবং করোনা মহামারিতে অর্থনৈতিক স্থবিরতা নানাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক উপস্থিতি ব্যাহত করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী তত্ত্ব অনুযায়ী একটি রাষ্ট্র যখন তার ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক শক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে বিশ্ব-রাজনৈতিক অঙ্গন প্রাভাবিত করার মতো বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হয়, তখনই তাকে পরাশক্তি বলা হয়। এক্ষেত্রে সেই ১৯৯১ সালে সমাজতান্ত্রিক পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলে পুঁজিবাদী পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক একমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা অনেকটা সুগম হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩-২০১৭ পর্যন্ত দুই মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজে বিল ক্লিনটন, জর্জ ডাব্লিউ বুশ এবং বারাক ওবামা সহ মোট তিন জন প্রেসিডেন্ট অবস্থান করেছিলেন।

বিতর্কিতভাবে ২০১৬ সালের ৫৮তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করার পর ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারিতে ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন মার্কিন ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি তাঁর পূর্বসুরি প্রেসিডেন্টদের তুলোনায় সম্পূর্ণ আলাদা ও শ্বেত আধিপত্যবাদী মনোভাবের। তিনি ২০১৭ সালে একে একে তাঁর পূর্বসুরি বারাক ওবামার করা ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন, ইরানের পরমাণবিক চুক্তি, ওবামাকেয়ার স্বাস্থ্যনীতি ইত্যাদি বাতিল এবং অভিবাসী-বিরোধী নীতি গ্রহণ করে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন। আশ্চর্যজনকভাবে ২০১৮ সালে উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিম জং উনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন তাঁর উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে একটি, যা অনুমিতক্রমেই যেকোন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য ঐতিহাসিক মাইলফলক। তবে ২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে রীতিমতো ব্যার্থ হওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নির্বাচনে জো বাইডেনের জয় শুধু সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

উল্লেখ্য, জো বাইডেন ২০২১ সালের ২০শে জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার সাথেই কিন্তু তাঁর পূর্বিসুরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সকল ভুলের বোঝা বহন করতে হবে। এখানে ইতিবাচক দিক হলো তিনিই হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও প্রবীনতম প্রেসিডেন্ট, যার অর্ধশত বছরেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার আছে। আর সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার রানিংমেট থাকার অভিজ্ঞতা থাকায় তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অবস্থা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত থাকার কথা।

জো বাইডেনকে প্রথমেই করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে যুগোপযোগী ভূমিকা রাখতে হবে। কাজটি অনেক কঠিন, কিন্তু একেবারেই অসম্বব নয়। কিছুদিন আগেই ২০২০ সালের নভেম্বরের ১০ তারিখে মার্কিন ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিস্থান ফাইজা (Pfeiza) কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের উদ্ভাবন ও সফল পরীক্ষার ঘোষণা করেছে। এই ঘোর অন্ধকার ও হতাশার সময়ে এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিশ্চিতভাবেই আশার আলো। তার উপর তিনি ওবামাকেয়ার স্বাস্থ্যনীতি পূনর্বহাল করে কোটি কোটি চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত মানুষদের করোনা চিকিৎসার সুব্যবস্থা করতে পারেন।

চীনের সাথে ২০১৯ সাল থেকে বাণিজ্য যুদ্ধের জন্য ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের, অন্তত কয়েকশত বিলিয়ন মার্কিন ডলার তো খোয়া গেছেই। সেই সাথে দক্ষিণ-চীন সাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাষ্ট্র তথা ব্রুনেই, ফিলিপিন্স, তাইওয়ান এবং মালেশিয়ার জড়িয়ে পরা অবশ্যই প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য উদ্বেগজনক। আর উত্তর কোরিয়া পূর্বের ন্যায় পরমাণবিক কর্মসূচীতে মনস্থির করায় মিত্রদেশ দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরুপ। সেক্ষেত্রে জো বাইডেন তাঁর পূর্বসুরি ট্রাম্পের মতোন উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিম জং উনের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবেন নাকি ওবামার মতোন  কৌশলগত ধৈর্য অবলম্বন করবেন সেটা নিয়েই তুমুল আগ্রহ এখন।

একদিকে সেই চীন যখন বর্তমানে উইঘুর মুসলিমদের উপর বিনা বাধায় চরম নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে, অপরদিকে ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকারের প্রথানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেই ২০১৪ সালেই ক্ষমতায় আসার পর নানান প্রকার মুসলিম-বিরোধী আইন ও কর্মসূচী গ্রহণ করছেন। যেহেতু এবারের নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ মুসলিম অভিবাসীদের ভোট পেয়েছেন, এখানে জো বাইডেনকে তুখোড় কূটনৈতিক বিচক্ষনতার পরিচয় দিতে হবে। চীনের সাথে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের জন্য ভূকৌশলগত কারণে তিনি ভারতকেই সমর্থন করবেন চীনকে চাপে রাখার জন্য, নাকি ভারত ও চীন উভয়কেই চাপে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিমত্তার জানান দিবেন? তবে তিনি ১১ই নভেম্বরে স্পষ্ট করে ট্রাম্পের চীন-বিরোধী নীতিকে সমর্থন করার কথা ব্যাক্ত করেছেন। এটা বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা-সমাধানে কোন অবদান রাখবে কিনা সময়ই বলে দিবে।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল পরিস্থিতি স্বাভাবিকরণ ও মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার করার কর্মসূচী জো বাইডেনের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। একে ২০১৮ সালে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানীর স্বীকৃতি দিয়ে ব্যাপক সমালোচনায় পড়তে হয়েছিলো তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। জো বাইডেন হয়তো এক্ষেত্রে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবেই স্বীকৃতি বহাল রাখবেন। কিন্তু সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়া, চীন ও তুরস্কের সাহায্যে বাশার আল আসাদের জয়লাভ অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইলের এবং সৌদি আরবের জন্য মাথাব্যাথার কারণ। অপর দিকে ইরানের সাথে ২০১৫ সালে করা পরামাণবিক চুক্তি বাতিল করা আর সম্প্রতি ২০২০ সালে ইরানের উচ্চতর সামরিক কর্মকর্তা কাশেম সোলেইমানির হত্যাযজ্ঞের কারণে বিনা-বাধায় ইরান এখন পরমাণবিক কর্মসূচিতে অনেকটাই এগিয়ে যাচ্ছে। এখন বাইডেনের ইরান পররাষ্ট্রনীতিও ইজরায়েল ও সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেই সাথে দিন কে দিন মধ্যপ্রাচ্যে রাশিইয়ার উপস্থিতি বৃদ্ধিও জো বাইডেনকে নতুন করে মধ্যপ্রাচ্য পররাষ্ট্রনীতি ঢেলে সাঁজাতে হতে পারে গতানুগতিক ধারা থেকে বেড়িয়ে এসে।

১৯৪১ সালে জাপান কর্তৃক পার্ল হারবারে আক্রমণের পর ২০২০ সালে করোনা মহামারীর মতো এতো কঠিন সময় যুক্তরাষ্ট্রকে অতিবাহিত করতে হয়নি। কিন্তু সময় বদলেছে, বিশ্ব রাজনীতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সেই ১৯৪৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্টের অধ্যাবসায়ের কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়লাভ করে যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে । এখন জো বাইডেন করোনা মাহামারী জয় সহ নানান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন উচ্চতায় নিতে পারবেন কিনা, সময়ই বলে দিবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured