Homeবিবিধদক্ষিণা ক্রশ বা সাউদার্ন ক্রস: জ্যোতির্বিদ্যা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

দক্ষিণা ক্রশ বা সাউদার্ন ক্রস: জ্যোতির্বিদ্যা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের মধ্যে যদি কোন মিল থেকে থাকে, সেটা হচ্ছে দক্ষিণা ক্রশ বা সাউদার্ন ক্রস। এখন এই দক্ষিণা ক্রশ জিনিসটাই বা কি? যেখানে ক্রিকেটিয় ভাষায় অস্ট্রেলিইয়া আর নিউজিল্যান্ডের মধ্যে রয়েছে বিখ্যাত তাসমান-পাড়ের লড়াই বা ট্রান্স-তাসমান রাইভেলরি, সেখানেই দুই দেশের অভিন্ন ইতিহাস আর পতাকার নকশায় বহু মিল বা সাদৃশ্য পাওয়া যায়।

চিত্র-১: মহাকাশের এই ছবিটাকে প্রায় ৫৭° বাঁকা করে ধরলে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে দক্ষিণা ক্রশ বা সাউদার্ন ক্রস। পদার্থবিজ্ঞানের অসাধারণ ‘ডপলার ইফেক্টের’ কারণে ৫টার মধ্যে কোনোটাকে লালচে এবং কোনোটাকে নীলচে দেখাচ্ছে।

আমরা যারা ক্রিকেটের ভক্ত, তারা সম্ভবত কোনো না কোনো সময়ে একটা বিষয় নিয়ে নিশ্চয়ই ভাবান্বিত হয়েছি। অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের খেলা দেখার সময় বারবারই ভেবেছি, এই দুই দেশের পতাকায় এত মিল কেন? এমনকি দূর থেকে পতাকা দুটোকে দেখলে ভালোমতো বোঝাও যায় না, আলাদা করাও কষ্টকর। এর পেছনে আসলে কারণটা কী?

অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ড উভয়ই পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে অর্থাৎ দক্ষিণ অংশে অবস্থিত। এই দুই দেশকেই ওশেনিয়া মহাদেশের অন্তর্গত ধরা হয়। তবে কিছু ভূতাত্ত্বিকের মতে, নিউজিল্যান্ড দেশটা মূলত ‘জিল্যান্ডিয়া’ নামক অষ্টম মহাদেশের অংশ। সেটি অনেক বছর আগে পানির নিচে তলিয়ে গেছে, পানির উপরে আছে শুধুমাত্র নিউজিল্যান্ড দেশটা। যাইহোক, এই দুই দেশ পৃথিবীর মানচিত্রে খুবই ইউনিক পজিশনে অবস্থিত। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের ইউনিক জিওগ্রাফিক্যাল পজিশনের কারণে পৃথিবীর অধিকাংশ যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকেই এরা প্রায়শই বিচ্ছিন্ন ছিল। উদাহরণস্বরূপ দুই বিশ্বযুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ এবং অন্যান্য যুদ্ধ থেকে এরা মোটামুটি নিরাপদই ছিল সবসময়। তার মানে এই না যে এদের উপরে কোনো প্রভাবই পড়েনি, অবশ্যই পড়েছে। তবে সেটা বিশ্বের অন্যান্য জায়গার তুলনায় খুবই নগণ্য। দুই দেশেরই চারপাশে তেমন কোনো শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেই, চারদিকে শুধু সাগর আর সাগর। এরা প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূত্বকে অবস্থিত। এক বিশিষ্ট ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞ একবার উল্লেখ করেছিলেন, “The geopolitical advantage Australia and New Zealand enjoy, that is more than enough for shaping their foreign policy according to their own national interests“.

চিত্র-২: অস্ট্রেলিয়ার পতাকা এবং নিউজিল্যান্ডের পতাকা কাহন – ১. প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত হওয়ায় নীল পতাকা ২. ব্রিটিশ শাসনাধীন থাকায় বামে উপরে ‘ইউনিয়ন জ্যাক’ সিম্বল ৩. ডানপাশে সাউদার্ন ক্রসের ৫টা তারকা (হলুদ বৃত্ত দিয়ে চিহ্নিত) ৪. বামে ইউনিয়ন জ্যাকের নিচে অতিরিক্ত তারা অস্ট্রেলিয়ার ৬টা রাজ্য এবং সব দ্বীপকে বুঝায় ৫. অস্ট্রেলিয়া থেকে সাউদার্ন ক্রসকে সাদা রঙের দেখায় তাই তারাগুলো সাদা।

অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের চারপাশে নীল প্রশান্ত মহাসাগর আছে বলে এদের পতাকার রং এমন নীল। উভয়ই অনেক বছর ব্রিটিশ শাসনাধীন ছিল এবং এখন কমনওয়েলথের সদস্য বিধায় উভয়েরই পতাকার বামপাশে উপরে সমান সাইজের ‘ইউনিয়ন জ্যাক’ চিহ্ন বসানো আছে। এপর্যন্ত তো বোঝা গেল, তাহলে এই তারাগুলো কোথা থেকে এলো? এগুলোর মাহাত্ম্যই বা কী?

এখানেই জ্যোতির্বিদ্যার আগমন। শুরুতেই বলেছি, অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ড পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত। এরা ভৌগোলিকভাবে যে জায়গায় আছে, সেখান থেকে রাতের বেলা আকাশ পরিষ্কার থাকলে খালি চোখেই অসাধারণ সুন্দর একগুচ্ছ তারকারাজি (Constellation) দেখা যায়। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এই তারকারাজিকে একসাথে বলা হয় ‘CRUX’ বা ‘Southern Cross‘, কেননা এদেরকে একত্রে দেখতে ক্রসের মতো দেখায়। আমি পোস্টের সাথে প্রয়োজনীয় সব ছবি সংযুক্ত করে সাথে ব্যাখ্যা লিখে দিয়েছি, দেখলেই বুঝতে পারবেন। সাউদার্ন ক্রসে মোট ৫টা তারা আছে, যার মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা হলো একদম নিচেরটা। এর নাম আলফা এবং বাকিগুলোর নাম গ্রীক বর্ণমালার ক্রমানুসারে বিটা, গামা, ডেল্টা, ইটা। ক্লকওয়াইজ অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটার দিকে সিরিয়াল ধরতে হবে।

এই কারণে অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের পতাকার ডান পাশে এই ‘সাউদার্ন ক্রস’ তারকারাজি দেখা যায়। তার মধ্যে আরো মজার ব্যাপার হলো, নিউজিল্যান্ড থেকে এই তারকারাজির ৫টা তারার মধ্যে সর্বশেষ তারাটাকে তেমন একটা দেখা যায় না। তাই নিউজিল্যান্ডের পতাকায় আপনি মোট ৪টা তারা দেখতে পাবেন। এটা হলো দুই দেশের পতাকার প্রথম পার্থক্য।

এদের পতাকায় মোট তিনটা বড় পার্থক্য আছে, তার মধ্যে একটা বললাম। বাকি দুটো পার্থক্য হলো – অস্ট্রেলিয়ার তারাগুলো সাদা রঙের, নিউজিল্যান্ডের তারাগুলো লাল। আর অস্ট্রেলিয়ার পতাকায় ইউনিয়ন জ্যাকের নিচে আরেকটা বড় তারা আছে, নিউজিল্যান্ডের সেটা নেই। এগুলোর কারণ কী?

অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ড দুই দেশ থেকেই সাউদার্ন ক্রস দেখা গেলেও, অস্ট্রেলিয়া থেকে এগুলোকে সাদা তারকা বা White Star মনে হয়। অপরপক্ষে নিউজিল্যান্ড থেকে দেখলে এগুলোকে উজ্জ্বল লাল তারকা বা Red Star মনে হয়। এগুলো শুধুমাত্র দেখার দৃষ্টিকোণ, মহাদেশীয় দূরত্ব আর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই হয়। তাই অস্ট্রেলিয়ার ৫টা তারা সাদা আর নিউজিল্যান্ডের ৪টা তারা লাল রঙের।

এবার আসি অস্ট্রেলিয়ার সেই অতিরিক্ত বড় তারকার ব্যাপারে। এই তারাটার গায়ে মোট সাতটা কোণা আছে। ৬টা কোণা দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ৬টা রাজ্যকে বুঝানো হয় – ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া, সাউথ অস্ট্রেলিয়া, নিউ সাউথ ওয়েলস, কুইন্সল্যান্ড, তাসমানিয়া, ভিক্টোরিয়া। বাকি ১টা কোণা দ্বারা অস্ট্রেলিয়ার যত দ্বীপ বা টেরিটোরি আছে, সেগুলোকে একসাথে বুঝানো হয়। এই অতিরিক্ত তারাটা দিয়ে মূলত অস্ট্রেলিয়ার সার্বভৌমত্বকে জোর দেয়া হয়।

এই হলো অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের পতাকার মিল, ৩টি পার্থক্য আর ইতিহাসের সম্মিলন। মজার ব্যাপার হলো, এই সাউদার্ন ক্রস ব্রাজিলের কিছু অংশ থেকেও দেখা যায়। কারণ দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের একপাশ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পড়েছে। একারণে ব্রাজিলের পতাকার একদম মাঝখানে ভালো করে লক্ষ করলে এই সাউদার্ন ক্রসের ৫টি তারা দেখা যাবে। এছাড়াও প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত পাপুয়া নিউগিনি এবং পশ্চিম সামোয়া দেশ দুটির পতাকাতেও খুঁজে পাওয়া যাবে সাউদার্ন ক্রসকে। এগুলোর ছবিও আমি সংযুক্ত করে দিয়েছি।

তাছাড়া আরো কিছু দ্বীপরাষ্ট্র এবং দ্বীপসংগঠনের পতাকাতেও সাউদার্ন ক্রস আছে।

RELATED ARTICLES

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured