Homeবাংলাদেশপদ্মা সেতু : সম্ভাবনার নতুন দুয়ার ও বাংলাদেশের অর্থনীতি

পদ্মা সেতু : সম্ভাবনার নতুন দুয়ার ও বাংলাদেশের অর্থনীতি

একটি দেশের অর্থনীতির মানদণ্ডের ভিত্তি হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন একটি মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে।

পদ্মা সেতু একটি মাল্টিপারপাস রোড রেল ব্রিজ যা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। এই সেতু বাংলাদেশের পদ্মা নদীর উপর নির্মিত হচ্ছে এবং বাংলাদেশের উত্তর -পূর্ব অংশের সঙ্গে দক্ষিণ -পশ্চিম অংশের সংযোগ সৃষ্টি  করবে। ৬.১৫ কি.মি. দৈর্ঘ্য, ১৮.১০ মিটার প্রস্থ বিশিষ্ট এই সেতুটিতে ১৫০মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১এটি স্প্যান বসানো হবে ৪২ এটি পিলারের উপর যা মাওয়া ও জাজিরাকে দুইপাড়ে যুক্ত করবে। দুই স্তর বিশিষ্ট  স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাস ব্রিজটির ওপরের স্তরে থাকবে চারলেনের সড়ক পথ এবং নিচের স্তরটিতে থাকবে একটি একক রেলপথ যা ট্রান্স-এশীয় রেলওয়েতে যুক্ত হয়ে দেশের পরিবহন সেবায় দিগন্ত উন্মোচিত করবে। সেতুর মধ্য দিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস, বিদ্যুত, ফাইবার অপটিক ক্যাবলের সংযোগ ঘটবে ফলে অর্থনীতির ভিত শক্ত হবে।
বর্তমানে সবগুলো স্প্যান বসানোর ফলে এখন দৃশ্যমান স্বপ্নের পদ্মা সেতু। ২০২১ সালের জুন মাসে এই সেতুর পুরোপুরি কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে তাই মুজিব বর্ষে এটি হবে আমাদের জন্য  নতুন মাইলফলক। পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার পূর্বে এই প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে কিন্তু অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় কানাডিয়ান আদালত মামলাটি বাতিল করে দেয় তাই দেশের নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। সেতুটি বর্তমানে চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড এর আওতাধীন চায়না মেজর ব্রিজ নামক কোম্পানির মাধ্যমে কাজ করছে এবং বাংলাদেশ ব্রিজ অথরিটি দ্বারা নির্মাণের কাজ চলছে। ইতোমধ্য সেতুটির ৮০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।
পদ্মা সেতু অর্থনীতির ভিত্তি ও সোনালি সোপান হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বুনিয়াদ ও পূর্ণজাগরণ হবে এই সেতুর মাধ্যমে। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের কৃষিখাতে ব্যাপক পরিবর্তন হবে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল কৃষিতে উন্নত। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে যোগাযোগ সহজ হওয়ার ফলে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি পণ্য ঢাকায় চলে আসবে, ফসল নষ্ট হবে না, পণ্যের পরিবহন খরচ কমে যাবে এবং পণ্যের দাম ও মানুষের হাতের নাগালে থাকবে। কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে কৃষকরা ফসলের ন্যায্য দাম পাবে এবং আর্থিকভাবে লাভবান হবে।
বাংলাদেশের দুটি প্রধান সমুদ্র বন্দর দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত। পদ্মা সেতু মংলা ও বেনাপোল বন্দরের সংযোগ ঘটাবে। ফলে অর্থনীতি গতিশীল হবে। এই বন্দরগুলোর মাধ্যমে দেশের পণ্যের আমদানি-রফতানি বাড়বে। খুলনা থেকে রফতানিকৃত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী দ্রব্য হিমায়িত মৎস্য ও পাটশিল্পের রফতানি  বৃদ্ধি পাবে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১.২ শতাংশ বেড়ে যাবে। প্রতিবছর দেশের ২১জেলার দারিদ্র্য নিরসন ০.৮৪ শতাংশ কমে আসবে। দক্ষিণাঞ্চলের ৬কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, অবকাঠামো, সংস্কৃতি পাল্টে যাবে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রতিবছর মঙ্গা দেখা দেয়। পদ্মা সেতুর কারণে মঙ্গা কমে যাবে। মানুষের জীবনযাত্রার মানেরও উন্নতি হবে। ইতিমধ্যে পদ্মা সেতুর পাড়ে শিল্পকারখানা ও ইকোনমিক জোন নির্মানের কাজ চলছে। এইসব জোনে মেগা প্রজেক্ট, হাইটেক পার্ক, তাঁতশিল্প, পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনা আছে। এছাড়াও পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে যাতায়াত ব্যবস্থা অনেক উন্নত হবে৷ ঢাকার সাথে কলকাতার যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে তাই বাণিজ্যিক দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্কও বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে।
পদ্মার চরাঞ্চলে অলিম্পিক ভিলেজ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিটি, হাইটেক পার্ক, বিমানবন্দরসহ নানা উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পদ্মা সেতুসংলগ্ন জাজিরার নওডোবা এলাকায় প্রায় ২হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে আধুনিক আবাসন, শিক্ষা -চিকিৎসাসহ আধুনিক সব সুযোগ সুবিধা রাখা হবে যা এই এলাকায় বসবাসরত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কাজ করবে।
যশোর – বেনাপোল সড়কে ঝিকরগাছা উপজেলায় ৬শ একর জমির উপর ইলেকট্রনিকস, টেক্সাইল, ওষুধ, পোশাক শিল্পকারখানা নির্মানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে এই এলাকায় শিল্পায়ন ঘটবে এবং মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এই এলাকায় উৎপাদিত পণ্যের রফতানি বাড়বে। দেশী বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত। পর্যটন নগরী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের পর যশোর হবে তৃতীয় বাণিজ্যিক নগরী এবং বাংলাদেশের অন্যতম অর্থনৈতিক অঞ্চল।
পদ্মা সেতুর কারণে ফেরীঘাটগুলোতে যানবাহনের চাপ কমবে। নৌপথে দূর্ঘটনা কমবে। পণ্য পরিবহনে গতিশীলতা আনয়ন হবে। ঢাকার উপর জনসংখ্যার চাপ কমবে, কমবে পরিবেশ দূষণের মাত্রা।
 পদ্মা সেতু বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের লালিত স্বপ্ন। ২০৩৫-৪০ সালে বাংলাদেশ যে উন্নত দেশ হবে, সেক্ষেত্রেও এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। স্বপ্নের এই সেতুকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ।
RELATED ARTICLES

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured