Homeবাংলাদেশপার্বত্য চট্টগ্রাম সংঘাত : পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হোক

পার্বত্য চট্টগ্রাম সংঘাত : পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হোক

ভূমিকা 

পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতি পদে পদে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে সাধারণ জুম্ম জনগণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(জেএসএস) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামে সন্তু লারমা এবং প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে দুইটি পাহাড়ি সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠনের তান্ডবে সাধারণ জুম্ম জনগণ দিশেহারা। ঐ জংগী সংগঠন দুইটির কথামত না চললে, চাঁদা না দিলে জুম্ম জনগণকে হতে হয় খুন,গুম,ধর্ষণের শিকার।

পটভূমি 

১৯৯৭ সালে যে বছর ‘পার্বত্য চুক্তি‘ যা শান্তি চুক্তি নামে বহুল পরিচিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সে বছর হুমায়ুন আজাদের একটি বই প্রকাশিত হয় ‘ যা ছিলো ‘ পার্বত্য চট্টগ্রাম : সবুজ পাহাড়ের ভেতর প্রবাহিত হিংসার ঝর্ণাধারা। হুমায়ুন আজাদ সে সময় পাহাড়ি বনাম বাঙালি এবং শান্তিবাহিনী বনাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যকার যে বিরূপ সম্পর্ক,  সেটিকে প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করেছিলো। কিন্তু ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরের ২ তারিখে যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মধ্যে পার্বত্য চুক্তি হয়। আমরা সবাই তখন আশা করেছিলাম এবার পাহাড়ের ‘হিংসার ঝর্ণাধারা ‘ বন্ধ হবে এবং শান্তির শ্বেতকপোত উড্ডয়ন করবে। কিন্তু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর লোকজন নিজেদের মধ্যে নানান দল উপদলে বিভক্ত হয়ে নিজেরাই রক্তের খেলায় মেতে উঠতে শুরু করে। পাহাড়ে প্রত্যাশিত শান্তির পরিবর্তে পুনরায় খানিকটা অশান্তি বিরাজ করতে শুরু করে।

পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের ২৩ বছর পরে এসে ও যখন পাহাড়িদের রক্তে পার্বত্য অঞ্চলের মাটি রঞ্জিত হয়। তখন সহজেই উপলব্ধি করা যায় ‘ পাহাড়ের হিংসার ঝর্ণাধারা’ এখনও বন্ধ হয়নি।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

১৯৭৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) গঠিত হয়। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম এবং গেরিলা যুদ্ধের শেষে একটি রাজনৈতিক সমাধান হিসেবে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র যোদ্ধারা অস্ত্র সমর্পণ করে শান্তিবাহিনী বিলুপ্ত ঘোষণা করলেও জেএসএস একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম গনতান্ত্রিক আন্দোলন জারি রাখে। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের বিরোধিতা করে একটি অংশ মূল দল থেকে বের হয়ে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ গঠন করে ১৯৯৭ সালেই। এরপর থেকেই মূলত জেএসএস এবং এর ছাত্র ফ্রন্ট পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিডি) সঙ্গে ইউপিডিএফ এর নিয়মিত এবং অনিয়মিতভাবে দ্বন্দ্ব – সংগ্রাম শুরু হয়। ২০১০ সালে মূল দল জেএসএস থেকে একটি গ্রুপ বিচ্ছিন্ন হয়ে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচয় দিয়ে জেএসএস ( এমএন লারমা) গঠন করে। এই জেএসএস ( এমএন লারমা) কে পূর্ণ সমর্থন দেয় ইউপিডিএফ। বিশেষ করে ২০১০ সালের পর থেকে চতুর্মুখী সংঘাত শুরু হয় জেএসএস (এমএন লারমা), জেএসএস ( সন্তু লারমা), ইউপিডিএফ এবং পিসিপি’র মধ্যে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে নভেম্বরে ইউপিডিএফ ভেঙে ইউপিডিএফ ( গনতান্ত্রিক) নামকরণ করে একটি নতুন ফ্রন্ট তৈরী করা হয়। জনশ্রুতি রয়েছে, ইউপিডিএফ (গনতান্ত্রিক) নামকরণ করে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন মূল দল জেএসএস ( সন্তু লারমা) এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়। ফলে চতুর্মুখী সংঘাত পঞ্চমুখী রুপ নেয়। এভাবেই পাহাড়ে আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যেকার ভাঙন এবং নানান দল ও উপদল মিলে নতুন করে হিংসার ঝর্ণাধারা সৃষ্টি করে। যারফলে পাহাড়ে নিয়মিত রক্তপাতের ঘটনা ঘটে।

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা 

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে যখনই কোন আদিবাসীকে হত্যা করা হয়, তখনই তাকে “ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ” কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই অথবা পাহাড়ি রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তঃকলহের জের হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যখনই ইউপিডিএফ এর কোন নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়, তখনই সেটি তার প্রতিপক্ষ হিসেবে পিসিপি অথবা জেএসএস (সন্তু লারমা) কে দায়ী করা হয়। যখনই জেএসএস (এমএন লারমা) এর কাউকে হত্যা করা হয়, তখনই জেএসএস(সন্তু লারমা) কে দায়ী করা হয়। আবার যখন জেএসএস(সন্তু লারমা) এর কাউকে হত্যা করা হয়,  তখনই সেখানে জেএসএস (এমএন লারমা) কে দায়ী করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যারা কমবেশি খোঁজ খবর রাখেন, তারা জানেন জেএসএস(সন্তু লারমা)  এর একচ্ছত্র আধিপত্য আছে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় এবং জেএসএস (এমএন লারমা) এর একচ্ছত্র আধিপত্য আছে খাগড়াছড়িতে। বান্দরবান পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্বত্য জেলা হলেও সেখানে জেএসএস (সন্তু লারমা), জেএসএস (এমএন লারমা) কারোরই কোন একচ্ছত্র আধিপত্য নেই। কিন্তু বান্দরবান কাদের দখলে যাবে তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রতিযোগিতা চলছে। বান্দরবানে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার অংশ হিসেবে উভয় পক্ষ যেমন সাংগঠনিক কার্যকর শুরু করেছে, তেমনি একে অন্যকে নির্মূল করার চেষ্টা করবে এটাও বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সভা সমাবেশের অধিকার, মত প্রকাশের উপর কড়া নিয়ন্ত্রণের ফলে সেখানে সংঘটিত ঘটনাসমূহের প্রকৃত চিত্র এদেশের সাধারণ মানুষ ও বহির্বিশ্বের কাছে বরাবরের মতন অন্তরালে থেকে যাচ্ছে। গণমাধ্যমের ওপর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বেদখল, আদিবাসীদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা, নারী নির্যাতন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, পরিবেশ ও বন ধ্বংস করার মতন ঘটনাগুলো নির্বিঘ্নে হতে পারছে। অন্যদিকে, কোভিডকালে সারাদেশের মতন পার্বত্য চট্টগ্রামের নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ চরম খাদ্য সংকট ও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে যায়। কোভিড-১৯ এর জন্য সরকারিভাবে যে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে সেই সহায়তা থেকেও পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে।

ভূমি বেদখল

পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের ভূমি বেদখল করে সেখানে পর্যটনের নামে রিসোর্ট গড়ে তুলে, উন্নয়নের নামে, রাবার বাগান প্রকল্পের নামে, সরকারি অবকাঠামো স্থাপনা, বিজিবি ক্যাম্প, নিরাপত্তা ক্যাম্প স্থাপনাসহ বিভিন্ন কৌশলে সরকারিভাবে স্থায়ী জমি অধিগ্রহণ করে আদিবাসীদের যেমন তাদের বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে, তেমনি বিভিন্ন ভূমিদস্যু, প্রাইভেট কোম্পানি, ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা লীজের নামে হাজার হাজার একর পাহাড় দখল করে স্থানীয় অধিবাসীদের সেখান থেকে উচ্ছেদ করছে। সম্প্রতি বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে স্থানীয় ম্রো আদিবাসীদের ভোগদখল করা প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ একর জমি দখল করে ‘ম্যারিয়ট ‘ নামে একটি পাঁচ তারকা হোটেল ও অ্যামিউজমেন্ট পার্ক স্থাপন করা হচ্ছে। এটি যৌথভাবে নির্মাণ করছে সেনা কল্যাণ ট্রাস্ট ও বিতর্কিত সিকদার গ্রুপ।(ঢাকা ট্রিবিউন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০)

অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু সমস্যা

ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের ১২,২২২ (বার হাজার দুইশত বাইশ) পরিবার ছাড়াও পার্বত্য তিন জেলায় প্রায় ৮০ (আশি) হাজারের অধিক অভ্যন্তরীণ  উদ্বাস্তু পরিবার রয়েছে। দীর্ঘ দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের অনেকেই এখনো নিজ ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে পারেননি। প্রত্যাগত শরণার্থীদের দাবি অনুযায়ী এখনো প্রায় ৪০ টি গ্রাম সেটেলার বাঙ্গালিদের দখলে রয়েছে। ফলে প্রায় নয় হাজার পরিবার তাদের বাস্তুভিটা এখনো ফিরে পায়নি। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের পর সরকার “ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন সম্পর্কিত টাস্কফোর্স” গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন দৃশ্যমান উদ্যোগ কিংবা পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। আশির দশকে যেসব ছিন্নমূল বাঙ্গালি পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের নামে সমতল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সরকার তাদের প্রায় ৪০ বছর ধরে রেশন দিয়ে যাচ্ছে। অথচ অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের বিষয়ে সরকার নির্লিপ্ত ও উদাসীন। ( সমকাল, ৯ নভেম্বর ২০২০)।

শেষ কথা 

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল, পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের ২৩ বছর পরও চুক্তির মৌলিক কয়েকটি বিষয় এখনো অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর কাছে ভূমি ব্যবস্থাপনা, পুলিশসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি হস্তান্তর না করা, স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা প্রণয়নপূর্বক স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থাপিত সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার না করা, ভারত প্রত্যাগত পাহাড়ি শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের যথাযথভাবে পুনর্বাসন করতে না পারার বিষয়গুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

যেকোন হত্যাই নিন্দনীয়। পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর নানান উপদল যদি নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব -সংঘাত জিইয়ে রাখে, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম জনগণের জীবনে কোনদিনই শান্তি আসবে না। আর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যদি কোন দৃশ্যমান এবং গ্রহনযোগ্য উন্নতি না ঘটে, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সেনাবাহিনীসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অধিকতর উপস্থিত ন্যায্যতা তৈরি করে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে – যদি পাহাড়ের রাজনীতি হয় পাহাড়ের কল্যাণ সাধন করা, তাহলে হত্যার রাজনীতি কোনদিন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হোক।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured