Homeআন্তর্জাতিকফুটবল এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: মধ্যপ্রচ্যের দেশ কর্তৃক স্পোর্টসওয়াশিং (পর্ব ১)

ফুটবল এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: মধ্যপ্রচ্যের দেশ কর্তৃক স্পোর্টসওয়াশিং (পর্ব ১)

মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস নামেই অধিক পরিচিতো) ২০২০ সালে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন যখন তিনি ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগের নিউক্যাসল আপন টাইনভিত্তক দল নিউক্যাসল ইউনাইটেড এফসি (ফুটবল ক্লাব) ক্রয় করার ঘোষণা দেন। কিন্তু নিউক্যাসল ইউনাইটেডের ভক্ত-সমর্থক আর অংশীদারগণের তুমুল সমালোচনা এবং বিরোধের জেরে মোহাম্মদ বিন সালমানকে এই পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয়েছিলো।[1] কেননা মোহাম্মদ বিন সালমানের মতোন সৌদি যুবরাজের নামে রয়েছে একাধিক মানবতাবিরোধী অপরাধ আর নিজ দেশের সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে গুম করে হত্যা করা তো আর নতুন খবর না।

চিত্র-১: নিউক্যাসল ইউনাইটেডের সমর্থকদের সমালোচনার মুখে পড়ে শেষমেশ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নিউক্যাসল ইউনাইটেড ক্রয় করতে পিছপা হন।

শুধু মোহাম্মদ বিন সালমানই না; গত দুই দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ধনকুবের আর রাজবংশের লোকদের মাঝে পেট্রডলারের বিনিময়ে ইউরোপের বিভিন্ন ফুটবল লিগের উঁচুসারির দল কেনার প্রবণতা দেখা গিয়েছে। এটা সত্যি বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য তেলের সাগরে ভাসছে, জ্বালানি তেল-রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতির উপর ভর করে তাঁদের জীবিকার মান ও আয় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না যে মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগই দেশই চাচ্ছে কোন না কোন ভাবে পাদপ্রদীপের আলোতে আসতে এবং নিজদের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে। যেখানে ফুটবল একটি বৈশ্বিক খেলা, পৃথিবীর ৫০০ কোটির ও বেশি মানুষ এই খেলার ভক্ত, সেই দিক দিয়ে ইউরোপের উঁচুসারির ফুটবল দলের মালিকানা বা স্পন্সর হওয়া তো ব্যবসায়িক ও বিশ্বরাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে উভয়ভাবেই লাভজনক।

বর্তমানে ইউরোপে ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগ, জার্মানির বুন্দেসলিগা, ইতালির সিরি আ এবং স্পেনের লা লিগা সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং ব্যবসায়িকভাবে সফল ঘরোয়া ফুটবল লিগ। কিছুদিন হলো ফ্রান্সের লিগ অ্যাঁ ও বেশ জনপ্রিয় হওয়া শুরু করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রতিভাবান ফুটবলারদের ঢল কিন্তু এসব লিগেই। সেসব লিগ গুলো তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীপূর্ণ হওয়ার ফলশ্রুতিতে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে রয়েছে উচ্চ পারিশ্রমিক এবং পেশাদারিত্ব, যা সব ফুটবলারদের কাছেই কাম্য। আর একই সাথে উন্নত জীবণের হাতছানি তো রয়েছেই। সেই সাথে রয়েছে প্রচারণার পাদপ্রদীপের আলোয় এসে নিজেদের জাতীয় দলে জায়গা পাবার সুবর্ণ সুযোগ।

এখন কথা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের আরব ধনকুবের আর রাজবংশের লোকেদের মাঝে ইউরোপের  ফুটবল লিগ গুলো হঠাৎ করে কিভাবেই বা জনপ্রিয় হলো বা কেনই বা হলো? কি কি কারণে তাঁরা তাঁদের কষ্টার্জিত পেট্রোডলারের বিনিময় মিলিয়ন বা বিলিয়ন বিলয়ন ডলার খরচ করে এই ক্লাবগুলো কিনছেন? এরই যৌক্তিক বিশ্লেষণ আমি দুই পর্বে ভাগ করে আলোচনা করবো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে। আজ প্রথম পর্ব।

কিছুদিন আগে (মে মাসের ২৯ তারিখে) অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ২০২০-২০২১ মৌসুমের ফাইনাল। সেখানকার অল-ইংলিশ ফাইনালের প্রতিদ্বন্দ্বীটা করছিলো ইংলিশ জায়ান্ট চেলসি এবং ম্যানচেস্টার সিটি। তবে সেখানে দুই ক্লাবের খেলার মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বীতার চেয়ে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো চেলসির মালিক রুশ ধনকুবের রোমান আভ্রামোভিচ আর ম্যানচেস্টার সিটির  মালিক আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং ধনকুবের শেখ মনসুর বিন আল নাহিয়ানের ভিআইপি গ্যালারিতে সরব উপস্থিতি। উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা থেকে ম্যানচেস্টার সিটি ২০ কোটি পাউন্ডের বিনিময়ে (বর্তমান হিসেবে ২৩৪১ কোটি টাকা)  ক্রয় করেই কিন্তু আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন শেখ মনসুর। যদিও কাই হ্যাভার্জের ৪২ মিনিটের হেড থেকে করা গোলে চেলসি তার ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জিতেছিলো, ম্যানচেস্টার সিটি কিন্তু গত ১০ বছরে ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ফুটবলের ইতিহাসে রেকর্ড ট্রান্সফার ফি গড়ে খেলোয়াড় আনলেও তাদের কাছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি কিন্তু অধরাই রয়ে যায়, যদিও এরই মাঝে তারা ৫ বার ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জিততে সক্ষম হয়েছে।[2]

চিত্র-২: উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ২০২০-২০২১ মৌসুমের ফাইনালে দুই ইংলিশ জায়ান্ট চেলসি ও ম্যানচেস্টার সিটির মাঠের দ্বৈরথের চেয়েও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন চেলসির রুশ কর্ণধার রোমান আভ্রামোভিচ (বামে) এবং ম্যানচেস্টার সিটির সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্ণধার শেখ মনসুর বিন আল নাহিয়ান (ডানে)।

এখানে শেখ মনসুরের আক্ষেপের জায়গা হতে পারে কাছে গিয়েও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফিটার নাগাল না পাওয়া। খেলার মাঠে ঐদিন ব্যার্থ হলেও তিনি কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একটি জায়গায় বেশ সফল। আর সেটি হলো স্পোর্টসওয়াশিং (Sportswashing) এর মাধ্যমে আরব আমিরাতের সকল জনগণকে মগজধোলাই দেওয়া, যাতে খেলায় বুদ হয়ে তাঁরা যেন আরব আমিরাতের রাজবংশের নানা প্রকার রাজনৈতিক নিপীড়ন আর অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে তোয়াক্কা না করে।

পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে অগণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেই। সেখানকার শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি রাজতন্ত্রিক। গণতন্ত্র নিয়ে উচ্চবাচ্য বা রাজবংশের শসনের সমালোচনা করলে তো নির্ঘাত মৃত্যু, গুম বা ফাঁশি যেকোন ভাবে। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ইজরাইলের সাথে গোপন সন্ধির সমালোচনা আর জনগণের দৃষ্টির সম্মুখে আনার জন্যই কিন্তু সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে নির্মম ভাবে গুম করে হত্যা করা হয়েছিলো ২০১৮ সালে। অথচ সেই বছর সৌদি আরবের জেদ্দায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক রেসলিং (কুস্তি) সংগঠন ডাব্লিউ ডাব্লিউ ই (World Wrestling Entertainment, WWE) এর দুটি মেগা আসর গ্রেটেস্ট রয়াল রাম্বল (Greatest Royal Rumble) আর ক্রাউন জুয়েল (Crown Jewell) অনুষ্ঠিত হয়েছিলো মাত্র ৬ মাসের ব্যবধানে।  সবচেয়ে বড় কথা, জামাল খাসোগিকে গুম করার দুই সপ্তাহ পরেই হয়েছিলো ক্রাউন জুয়েল মেগা আসর। WWE এর আয়জনের তড়িঘড়ি দেখে অনুমিতক্রমেই বুঝা যাচ্ছিলো যে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশেই খাসোগির গুম ও হত্যাকান্ড সৌদি জনগণের চক্ষুআড়াল করার জন্যই উদ্দেশ্যপ্রণিত।[3]

চিত্র-৩: সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে নির্মমভাবে গুম করে হত্যা করার দুই সপ্তাহের পরেই সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত হয় ডাব্লিউ ডাব্লিউ ই (WWE) এর মেগা আসর ক্রাউন জুয়েল (Crown Jewell), অক্টবর ২০১৮ সালে।

শুধু রেসলিং (কুস্তি) দিয়ে না, ফুটবলকেও সফলভাবে জনগণের স্পোর্টসওয়াশিং এর জন্য ব্যবহার করে আসছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজপরিবারগণ। বিশ্বের সবচেয়ে দামী ও প্রভাবশালী ক্লাবের মালিকানা থাকায় স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা নিজেদের দেশে ঢালাও করে তা প্রচার করে। সেই সাথে প্রতিবছরে মালিকের অনুরোধে/নির্দেশে অফ-সিজনে সেই ক্লাব গুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রস্তুতি ক্যাম্প করে জনগণের দৃষ্টি নিজেদের দিকে এনে অন্য দিকে ধাবিত করার জন্য। আবার ফুটবলের মালিকানা থাকায় তার শুধু নিজদের জনগণের কাছে না, যে দেশের ক্লাবটির মালিক সে দেশের জনগনের মাঝেও কিন্তু তারা সমান বৈধতা পাচ্ছেন।

চিত্র-৪: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিটি ফুটবল গ্রুপের কর্ণধার শেখ মনসুরের মালিকানাধীন ফুটবল ক্লাব।

শেখ মনসুরের কথাই ধরা যাক না। তিনি একে তো আরব আমিরাতে উপ-প্রধানমন্ত্রী, তিনি একই সাথে সিটি ফুটবল গ্রুপের (City Football Group) ছায়াতলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের অন্যতম সফল দল নিউ ইয়র্ক সিটি, অস্ট্রেলিয়ার ফুটবল লিগের সফল দল মেলবর্ন সিটি, ভারতের ইন্ডিয়ান সুপার লিগের দল মুম্বাই সিটি, চীনের সুপার লিগের দল সিচুয়ান জিউনিউ এবং জাপানের জে-লিগের দল ইয়োকোহামা ম্যারিনোস এরও কর্ণধার তিনি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, উল্লিখিত দলগুলোর খেলাগুলোতেও তাঁর সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে সেসব দলের সমর্থকদের সাথেও তার গভীর সখ্যতা হয়েছে এবং পূর্ণ সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।

মোদ্দাকথায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যাপক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। রাজনৈতিক স্বার্থ বলতে এখানে রাজপরিবারের শাসনকে উল্লিখিত দেশকর্তৃক বৈধতা ও স্বিকৃতি দেওয়া। আবার অর্থনৈতিক স্বার্থের বিচারে আরব আমিরাতের পেট্রোডলার আয় করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো উল্লিখিত দেশ। এক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই আরব আমিরাতের পেট্রডলারের সিংহভাগ (১৪.২৭%) আসে, তারপর একাধারে ভারত (৯.৮৫%),  জাপান (৮.৯৬%) এবং চীন (৭.২%)।[4]

অনুমিতক্রমেই এসব দেশের সাথে আরব আমিরাতের ভালো সম্পর্ক রাখতে হয় আর ভালো সম্পর্ক রাখার অন্যতম মাধ্যম ধরা হয় স্থানীয় জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া। সেই হিসেবে শেখ মনসুর পুরোপুরি সফল, সিটি ফুটবল গ্রুপের অন্তরায় তিনি যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন এবং জাপানের ফুটবল লিগের দলের সমর্থকদের কাছে প্রসার ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। সেসব ক্লাবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে বেশ কয়েকবার শিরোপাও জয় করার পাশাপাশি সমর্থকদেরও পূর্ণ সমর্থন পেয়েছেন। আবার তিনি যেহুতু একাধারে উপ-প্রধানমন্ত্রী, এই জনপ্রিয়তা এবং সমর্থন সেসব দেশের সরকারের সাথে আরব আমিরাতের গভীর সখ্যতা গড়ে তুলতে সহায়তা করছে।

[1] Wright, J., 2020. Newcastle United takeover off as Saudi-led consortium pulls out | Goal.com. [online] Goal.com. Available at: <https://www.goal.com/en/news/newcastle-united-takeover-off-saudi-led-consortium-pulls-out/1r63km8qog7pm1rvyqqx6ir8q9> [Accessed 20 June 2021].

[2] “Champions League Final: Meet The Winners”. 2021. UEFA.Com. https://www.uefa.com/uefachampionsleague/news/0269-1232c11f0fed-748a15c77d17-1000–meet-the-winners/.

[3] Roling, Chris. 2018. “After All Of The Controversy, Why WWE Crown Jewel Was A Bust”. Bleacher Report. https://bleacherreport.com/articles/2804227-after-all-of-the-controversy-why-wwe-crown-jewel-was-a-bust.

[4] Uae-embassy.org. n.d. Open Economy | UAE Embassy in Washington, DC. [online] Available at: <https://www.uae-embassy.org/uae-us-relations/business-trade/open-economy> [Accessed 20 June 2021].

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured