Homeতত্ত্ববাংলাদেশের সামাজ-সাংস্কৃতিক অভিঘাত: গ্রামসীর সামাজিক শৃঙ্খল তত্ত্ব

বাংলাদেশের সামাজ-সাংস্কৃতিক অভিঘাত: গ্রামসীর সামাজিক শৃঙ্খল তত্ত্ব

একটি বিদ্বান সমাজ গঠন করতে হলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচরণের সমষ্টি, অনুভূতি, মুল্যবোধ ও রীতিনীতি হলো প্রধানতম বিষয়বস্তু যার উপর ভিত্তি করে সমাজের বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের উন্মেষ ঘটে। সাংস্কৃতিক অসম্পূর্ণতা ও অসংলগ্নতা কিংবা ঐকতান হতে বিচ্যুতি সমাজের ভঙ্গুরতা, অন্তর্দ্বন্ধ ও কলহ সৃষ্টিরই নামান্তর। মানব সমাজের সার্বিক উন্নয়নে সামাজ-সাংস্কৃতিক উনয়নের অবদান অনস্বীকার্য। সমাজের উন্নয়নে সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা এবং বৈষম্য কিংবা সাংস্কৃতিক চর্চায় সামাজিক বিরোধ উভয়ই সমাজের জন্য বিরূপ প্রভচাব বয়ে আনে। সম্প্রতি মানুব উন্নয়ন সুচক-২০২০ এর প্রকাশিত সুচকে বাংলাদের অবস্থান ১৩৩তম যা বিগত বছরের তুলনায় চারধাপ এগিয়ে আছে। কিন্ত দুঃখের বিষয় হল, অর্থনৈতিক উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও সার্বিক উন্নয়ন বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার অন্যতম কারণ দর্শানো হয়েছে আর্থ-সামাজিক ও সামাজ-সাংস্কৃতিক বৈষম্য যা দৈনন্দিন মানুষের জীবনের সাথে সম্পর্কিত।

অর্থনৈতিক দিক হতে বাংলাদেশ পুর্বের তুলনায় অগ্রগতি সাধন করলেও জীবনযাপনের মান বেড়েছে ধীরগতিতে। শিক্ষা, আয়ু, মানবিক নিরাপত্তা, নারী-পুরুষ সমতা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগ উন্নয়নে পরিবর্তন খুবই লক্ষণীয়। তবে বাংলাদেশের জীবন-মানের উন্নয়ন নির্ধারণ কেবলই কি অর্থনৈতিক? উন্নয়নের সাথে সামাজ-সাংস্কৃতিক ঐকতান কি ভঙ্গুরের পথে? কেন বৈষম্যই উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা? অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বিরোধ ব্যতিত আরো কি বৈষম্য আছে? করোনা মহামারি সমাজে মিশে থাকা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে নীরবে নাড়া দিয়েছে।

সাংস্কৃতিক অভিঘাত হলো সেই স্ববিরোধী সংস্কৃতি যা দেখে মানুষ চমকিত হয়। অভিভূত হয় যার দৈনন্দিন সংস্কৃতির সাথে সম্পর্ক নেই। যা মানুষের অনুভূতিকে নাড়া দেয়, যা আজন্ম লালিত সংস্কৃতিতে ভাবে উদয় সৃষ্টি করে। উদাহরণ স্বরুপ করোনা মহামারি একটি আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি বহন করে চলেছে যা বিভিন্ন দেশের বিদ্যমান সমাজ-সংস্কৃতিকে মুখোমুখি দাড় করায়। সেই সুত্র ধরে বাংলাদেশের সমাজকে বিশ্লেষণ করলে যে সাংস্কৃতিক অভিঘাত গুলো পাওয়া যায় যা উন্নয়নের গতিধারাকে ব্যাহত করে তার আলোচনা হওয়া দরকার।

মহামারি মানুষকে যেখানে অাপন প্রাণ বাচাতে ব্যস্ত রেখেছে, যেখানে জীবন-মরণে হুমকি নিয়ে এসেছে, সচেতন কিংবা অবচেতন মনে এরা অনেকেই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল আচরণে ব্যর্থ। মহামারির কঠিন সময়ে সরকারি ও বেসরকারি অনুদানের যথা সম্ভবপর ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই লকডাউনকেই সাময়িক সরকারি রাজনৈতিক পন্থা বলে উড়িয়ে দেয়। মার্চের শেষের দিকে করোনা আক্রান্ত সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে বিভিন্ন উপলক্ষে গণজমায়েতও শুরু হয়। ‘গণজমায়েত’ শব্দটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিভাষা বিরোধের মাপকাঠি হিসেবে অনেকেই তুলে ধরেন যার ফলস্বরূপ দেখা যায়, বিদ্বান সমাজ ও শিক্ষিত সমাজের মধ্যে ভাবের একটা বড় পার্থক্য বিদ্যমান।

মহামারিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন পরিভাষা যেমন লকডাউন, আইসোলেশন, কোয়ারান্টাইন, হাত-ধোয়া কিংবা মাস্কের ব্যবহার মানুষের কাছে বিকৃত হয়েছে বারংবার এবং পরিভাষাগুলোর পরিধিও কমেছে। ব্রাকের সুশাসন ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের তত্ত্ব মতে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষ নির্বিচারে ও ভুঁইফোড় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম বারংবার পরিভাষা গুলো বিকৃত করায় মানুষের অনুধাবনে পরিবর্তন নিয়ে এসেছে যার দরুন অনেকেরই কাছে পরিভাষাগুলো রুপক অর্থে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। অপ্রত্যাশিত ভয় ও দায়িত্বহীনতা মানুষের মনে আলোড়িত হয়ে এমনরুপ ধারণ করে যে মানুষ সাধারণ মৃত্যুকে করোনা-মৃত্যু বলে অবহিত করতে লাগে একপর্যায়ে। ভুক্তভোগী পরিবার অঘোষিত সামাজিক বয়কটের স্বীকার হয়ে যায় ভাগ্যের নির্মম চাকায় ঘুরতে ঘুরতে। ফলস্বরূপ, সামাজিক অসহযোগিতা ও সংঘাত যা সামাজিক সংহতিতে ফাটল ধরানোর অন্যতম কারণ।

যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় শহর কেন্দ্রিক বাস্তবতা গ্রামীণ সমাজে স্থানান্তরিত হয়ে গ্রামীন অভ্যান্তরিণ রাজনীতি ও আন্ত-সাম্প্রদায়িক কলহ আরো বেগবান হয়। জমিদখল, বাল্যবিবাহ বা নারী নির্যাতনের মত ঘটনাবলির পাশাপাশি শহরকেন্দ্রিক ও গ্রামভিত্তিক আচরণগত ও মতামতগত পার্থক্য সমস্যার নতুন মাত্রা দেয়। মানবিক স্বার্থের কাছে সাংস্কৃতিক ঐক্যের নির্দেশকগুলো দুর্বল এবং অবাস্তবিক রুপে ধরে নেয়া হয়। তবে এক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমগুলো সামাজ-সাংস্কৃতিক অনৈকের পেছনে বড় কারণ যার প্রমাণ পাওয়া সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহৃত ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি হতে, যা অতি ক্ষুদ্র বিষয়কে বিরাট পরিষরে সামাজিক দাঙ্গা সংগঠিত হওয়ার কারণ বলে চিহ্নিত করা যায়।

শহর ও গ্রাম কেন্দ্রিক প্রশাসনিক তৎপরতায় পার্থক্য থাকায় মানুষের আত্ননিরাপত্তার পন্থা নির্ধারণ করাও একটা বড় বিষয়। মানুষের অবস্থান যেখান ঘরে সেই ঘরে থাকা রীতিমতো আটকে থাকারই নামান্তর। মানুষকে যতই নিরাপদে থাকার গুরুত্ব দেয়া হোক না কেন তা প্রশাসনিক দায়িত্ব এড়ানো বলে অনেকেরই ধারণা। নিরাপত্তার নির্দেশনা ও সরকারি তদারকি অনেকে পুলিশি হয়রানি বলে মনে করেন। নিজস্ব নিরাপত্তার চেয়ে পুলিশি ভয়ই মানুষের কাছে করোনার চেয়ে বেশি ভয় হয়ে দেখা দেয়।

সাংস্কৃতিক পরিচর্যা জাতির অস্তিত্ব ও সংহতি ধারণ করে। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুতি সামাজিক মানুষের কৃষ্টি-কালচার ও মুল্যবোধ বিকাশে বড় বাধা দেয়। সামাজিক ধর্ম ও সাংস্কৃতিক বিরোধ সমাজ ও সংস্কৃতিকে সমভাবে ক্ষতি করে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে বিরোধ যেমন আচার ব্যবহারে অভিবাদন, সাংস্কৃতিক আচরণে ঐতিহ্য কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা নিয়ে পরষ্পর বিরোধ সম্মিলিত উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে।

এই যে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে নিজেদের মধ্যে বিরোধ যা হতে বৈষম্য সৃষ্টি হয়। যার ফলে কিছু সমাজের অভিজাতশ্রেণী ফায়দা লুটে। জ্ঞাননিষ্ঠ সমাজে এই বৈষম্য থাকেনা। গ্রামসীর সামাজিক শৃঙখল তত্ত্বের আলোকে এই বৈষম্য দুভাবেই হতে পারে। হয়তো মানুষ বৈষম্যের এই সংস্কতিকে মেনে নেয় নয়তো প্রতিবাদ করে। মুলত সমাজের মানুষ কর্তৃক এই ধরনের বৈষম্যের বৈধতা বড় পরিসরে সমাজকে শোষণ ও বিপথে নিয়ে যায়।

তাহলে উপায়? কি শিখলাম মহামারী থেকে?

বিদ্বান সমাজ গঠন করতে হলে সামাজিক সংহতি ও সহিষ্ণুতা মানুষের মনে জাগিয়ে দিতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অন্যতম প্রধান নিয়ামক হলেও সামগ্রিক উন্নয়নে সামাজ-সাংস্কৃতিক মিলনও অপরিহার্য। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গতিধারা তখনই যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় যখন সমাজ ও সংস্কৃতি তা গ্রহণ করে ও উন্নয়নে অংশীদার হয়। সময় এসেছে সমাজে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা বিস্তার করা, যার উদ্দেশ্য তথাকথিত গতিধারায় বাস্তবায়ন হবেনা বরং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান দিয়ে যা একদিকে সামাজ-সাংস্কৃতিক বিরোধ মেটাই অন্যদিকে আধুনিক জ্ঞান প্রসারিত করায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিষ্ঠান কিংবা জনসেবা প্রতিষ্ঠানে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের বিস্তার করা। তবে এজন্য ডিজিটাল বৈষম্য রোধ ও গ্রাম-শহুরে বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে।

বিশ্বায়নের শেকড় যদিও আমাদের সমাজে ব্যাপকহারে ব্যাপৃত তবুও সমাজ ও বিশ্বায়ন উভয়মুখী পরষ্পর তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। বিশ্বায়নের প্রভাব ব্যাপক হওয়ায় সমাজে তা যতই সাংস্কৃতিক সংঘাত তৈরি করুক না কেন সমাজকেও তার নিজস্ব গণ্ডির মধ্যে বিশ্বায়নের স্থান করে দেয়া সমীচীন। প্রান্তিক সমাজ হয়ে বেচে থাকা আধুনিক অর্থনৈতিক যুগে বড্ড বেমানান।

 করোনা মহামারি বলে দেয় জীবনে বেচে থাকাই সবকিছু। বেচে থাকার জন্য যে অর্থনৈতিক বুনিয়াদ তা সাময়িক বন্ধ হলেও যাতে সমাজ বিপথে না যায়। অবসর সময় যেন সমাজকে বিকল্প চিন্তা করতে উৎসাহিত করে। দৈনন্দিন দিনমজুর হোক কিংবা কর্পোরেট চাকরিজীবী হোক, সমাজ যেন মানবিক বিকাশকে গুরুত্ব দেয়। অর্থনৈতিক ও সামাজ-সাংস্কৃতিক বৈষম্য দুর হয়ে যেন সমাজে ঐকতান সৃষ্টি হয়। সৃজনশীল ও কর্মমুখী জীবনই যেন হয় সমাজের মানুষের প্রত্যাশা।

সামাজিক বৈষম্য যেহেতু  বিদ্বান সমাজ গঠনে প্রধান বাধা তাই সমাজের মধ্যে সকল ধরনের বৈষম্য  দুর করতে হবে। যদিও গ্রামসি অর্থনৈতিক সম্মতিবাদক সামাজিক সাংস্কৃতিক বৈষম্যের উপর বেশি জোর দিয়েছেন কিন্তু মনে রাখতে হবে আমাদের জীবনচরিত, আদর্শ বা সামাজিক সংস্কৃতি পশ্চিমা হতে ভিন্ন। সুদীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐকতান ধরে রেখেছি ধর্ম, বর্ণ এবং সম্প্রদায়ের উর্ধ্ব রেখে। তাই সামাজিক শৃঙ্খলও হতে হবে তদ্রূপ যে শৃঙ্খল আমাদের উন্নয়নে উৎসাহিত করে। যে শৃঙ্খল বৈষম্য দুর করে। অবশ্যই যে  শৃঙ্খল আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের পিছিয়ে না দেয়।

পরিশেষে, সামাজিক সংস্কৃতিকে বুঝা ও অনুধাবন করাই হলো সমাজ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সোপান। সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে সামাজ-সাংস্কৃতিক বিরোধ সমাজে বৈষম্য ও অরাজকতা নিয়ে আসে। বিদ্বান সমাজ হতে হলে জ্ঞানহীন সম্মতিবাদক সংস্কৃতি বাদ দিতে হবে। এককথায়  বুদ্ধিজীবী সমাজ গঠন করতে হলে স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমরা সমাজের মানুষ নিয়ে যেমনই প্রতিবাদ করেছি গণতান্ত্রিক উপায়ে সম্মিলিত ভাবে সেই সমাজের অপেক্ষায়।  দুঃসময়ে সাংস্কৃতিক ঐক্য জাতির জন্য অবশ্যই একটি বড় ব্যাপার যেহেতু সমাজ প্রতিনিয়ত অভ্যন্তরিণ ও বাহ্যিক সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured