Homeতত্ত্ববাজারবাদ বা লিবারেলিজমের প্রাথমিক পাঠ

বাজারবাদ বা লিবারেলিজমের প্রাথমিক পাঠ

ভূমিকা

বর্তমান পৃথিবীর ভূরাজনীতি এবং আন্তঃরাষ্ট্রিয় সম্পর্ক (বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত) যখন শক্তিবাদ (Realism) তত্ব দিয়ে এতো সুন্দর করে ব্যাখ্যা করা যায়, তখন বাজারবাদের বা লিবারেলিজমের (Liberalism) মতোন অতিরঞ্জিত এবং পশ্চিমা স্বার্থসংশ্লিষ্ট তত্ব কেনই বা আমাদের শেখা বা জানা উচিৎ? মোদ্দাকথায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বিতর্ক তথা শক্তিবাদের হতাশাবাদী (Pessimistic) চিন্তাধারা বনাম বাজারবাদের আশাবাদী (Optimistic) চিন্তাধারা বুঝতে হলে বাজারবাদ তত্ত্ব শেখা বা জানার কোনো বিকল্প নেই। যেখানে শক্তিবাদ তত্ব একটি রাষ্ট্র কর্তৃক অসিম ক্ষমতা বা শক্তির অর্জনকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে এবং মানুষের নানান প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি ও আর্তমানবিক গূণাবলিকে বৃদ্ধ-আঙুল দেখায়, বাজারবাদ আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি প্রদর্শন করে।

বাজারবাদ মনে করে মানুষের বেশ কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকা সত্বেও সে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে নিজের, সমাজের, দেশের এবং বিশ্বের মধ্যে আন্তঃব্যাক্তিয় (inter-personal), আন্তঃসামাজিক (inter-social), আন্ত-রাষ্ট্রীয় (inter-state) এবং বৈশ্বিক (global) সম্পর্ক গঠন করতে অবশ্যই পারবে।[1] শক্তিবাদীরা যদি প্রবল সামরিক শক্তি ও যুদ্ধের মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রদের দমিয়ে এবং দখল করে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেখানে বাজারবাদীরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই আজ আমরা বাজারবাদ তথা লিবারেলিজমের নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় শামিল হবো।

কেনই আমরা লিবারেলিজমকেবাজারবাদবলছি?

যেকোন আলোচনা শুরু করার আগেই অবশ্যই সেই আলোচনার বিষয়বস্তুকে সাধারণ পাঠক বা শ্রোতাদের কাছে ব্যাখ্যা করা উচিৎ। সেদিক দিয়ে চিন্তা করলে অনেক সাধারণ পাঠকের বা বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে মনে হতে পারে, লিবারেলিজম (Liberalism) এর বাংলা পারিভাষিক শব্দ দাঁড়ায় “উদারতাবাদ”। তাহলে এখানে বাজারবাদ তথা “বাজারের” কি সম্পর্ক? সোজা ভাষায় বললে, লিবারেলিজম কিন্তু তথাকথিত মানবিক গূণাবলি “উদারতার” চেয়ে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমের অভব-অন্টন ও দারিদ্র্যতা বিমোচন করে সত্যিকারের ব্যাক্তি-স্বাধীনতা অর্জনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বৃহত্তর ছবির দিকে তাকালে, ১৭৭৬ সালে বিখ্যাত স্কটিশ অর্থনীতিবীদ এডাম স্মিথ (Adam Smith) তাঁর কালজয়ি গ্রন্থ “Wealth of Nations” এ বর্ণনা করেছেন যে যুদ্ধ নয়; বরঞ্চ বিভিন্ন দেশের মধ্যে মার্কেট বা বাজার (যেখানে অর্থের লেনদেন হয় পণ্য ক্রয় এবং বিক্রয়ের মাধ্যমে) প্রতিষ্ঠার মাধমে তবেই সত্যিকারের আন্ত:রাষ্ট্রিয় সম্পর্ক গঠন এবং মানব উন্নয়ন সম্ভব।[2] এডাম স্মিথের এই চিন্তাধারা পুরোপুরি “বাজারবাদ” নামের সম্পূরক, তাই আমরা লিবারেলিজমকে ক্ষুদ্রতর “উদারতাবাদ” না বলে আরো বৃহত্তর “বাজারবাদ” বলছি। যারা বাম বা মার্ক্সবাদী, তাঁরা বেশিরভাগই লিবারেলিজমকে “পূঁজিবাদ” বলে অভিহিত করে থাকেন, যা আমরা পরবর্তি “মার্ক্সবাদ” আলোচনায় পূর্ণরূপে ব্যাখা করবো।

বাজারবাদের মূলবৈশিষ্ট

বাজারবাদী বা লিবারেলরা স্বাভাবতই মানব প্রকৃতি (human nature) নিয়ে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে থাকেন। তাঁরা মনে করেন জন্মগতভাবেই মানুষ ব্যাক্তিস্বাধীনতা (freedom) চায়। আর এই ব্যাক্তিস্বাধীনতার সাথে মানব প্রকৃতি এবং যৌক্তিক নীতির (rational principles) সমন্বয় ঘটিয়ে বিভিন্ন দেশ এবং ও সেখানে বসবাসরত জনগণের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ও পরষ্পর শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।[3] আবার বাজারবাদীরা এটাও স্বিকার করে্ন যে যদিও ব্যাক্তিপর্যায় মানুষ বেশ স্বার্থপর এবং প্রতিযোগী ভাবাপন্ন, এরপরেও মানুষে-মানুষে পারস্পরিক স্বার্থ (mutual interest) বিদ্যমান। সেদিক দিয়ে চিন্তা করলে এই পারস্পরিক স্বার্থকে পূঁজি করে ব্যাক্তিপর্যায় থেকে শুরু করে সমাজ, দেশ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সহযোগীতা সম্ভব। এই পারস্পরিক স্বার্থ থেকে আগত সহযোগী মনোভাবকেই ঘিরেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারবাদীরা বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন এবং যুদ্ধ-অরাজকতাহীন পৃথিবী তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন।

সর্বোপরী, যেখানে শক্তিবাদীরা রাষ্ট্রকে শক্তি বা ক্ষমতার কেন্দ্রস্থল মনে করে বেশি গুরত্বারোপ করেন (Machstaat বা রাষ্ট্র-কেন্দ্রিক চিন্তাধারা), সেখানে বাজারবাদীরা রাষ্ট্রকে “সাংবিধানিক সত্ত্বা” (constitutional entity) ছাড়া কিছুই মনে করেন না।[4] মোদ্দাকথায়, বাজারবাদীরা প্রচন্ডরকম “Rechstaat” বা জনগণ-কেন্দ্রিক চিন্তাধারায় মগ্ন থাকেন। উনিশ শতকের প্রথম দিকের ইংরেজ দার্শনিক জেরেমি বেন্থাম (১৭৪৮-১৮৩২) এবং জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল ক্যান্ট (১৭২৪-১৮০৪) মনে করেন যে রাষ্ট্র মানুষ দ্বারাই সৃষ্ট এবং ব্যবসা ও বাণিজ্যের মাধ্যমে সকল রাষ্ট্রের মধ্যে মানুষ্য-সাদৃশ সম্পর্ক স্থাপন করে বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।[5]

বাজারবাদের প্রকারভেদ

যেহেতু আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তিকালের বাজারবাদ চিন্তাধারা এবং তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করছি, আমরা আপাতত পূর্ববর্তি আদর্শবাদী বাজারবাদ চিন্তাধারাকে (Idealist Liberalism) হিসাবে রাখছি না। উল্লেখ্য, এই চিন্তাধারা পত্তন ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর ১৯১৯ সালে ভার্সাই চুক্তি (Treaty of Versailles) স্বাক্ষরের সময় তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উডরো উইলসনের ১৪-দফা আদর্শবাদী ইশতেহারকে কেন্দ্র করে।[6] তবে ব্যাপক সাড়া জাগানো এই আদর্শবাদী বাজারবাদ চিন্তাধারার বেশ কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিলো বলেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ঘনিষ্ঠ মিত্র বৃটেন ও ফ্রান্স চিন্তাও করতে পারেনি যে তাদের স্বেচ্ছাচারি আচরণের জন্যই ১৯৩০ এর দশকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত জার্মানির উত্থান ঘটবে এডলফ হিটলার এবং তাঁর নাৎসি দলকে কেন্দ্র করে।  আমরা আপাতত সেই চিন্তাধারার সমালোচনা না করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তিকালের বাজারবাদের প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করছি। সেই দিক বিবেচনায় রাখলে বাজারবাদ মূলত ৪ প্রকার যথা –

১) সামাজিক বাজারবাদ (Sociological Liberalism)

২) পরস্পর-নির্ভর বাজারবাদ (Inter-dependence Liberalism)

৩) প্রাতিষ্ঠানিক বাজারবাদ (Institutional Liberalism)

৪) প্রজাতান্ত্রিক বাজারবাদ (Republican Liberalism)

আমারা এখন সংক্ষিপ্তভাবে উপরে উল্লিখিত চার প্রকার বাজারবাদের আলোচনা করবো।

সামাজিক বাজারবাদ (Sociological Liberalism): যেখানে শক্তিবাদীরা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক চর্চাকে মূলত এক বা তোতোধিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে মিথস্কৃয়া (interactions) মনে করেন, সামাজিক বাজারবাদীরা এই চিন্তাধারাকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের মতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শুধুমাত্র আন্তঃরাষ্ট্রিয় সম্পর্ক নয়, এখানে বহুজাতিক (transnational) সম্পর্কও বিদ্যমান (ব্যাক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, এবং সর্বোপরি রাষ্ট্র পর্যায় সম্পর্ক)।[7] তবে এর মানে এই না যে সামাজিক বাজারবাদীরা রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেই প্রত্যাখ্যান করছেন; তাঁরা রাষ্ট্রের চেয়ে ব্যাক্তি ও সামজিক পর্যায়ে মানুষে-মানুষে বিভিন্ন ধরণের সম্পর্কে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এই সম্পর্ক উন্নয়নের পেছনে পারস্পরিক  স্বার্থ বিদ্যমান এবং এই বিভিন্ন ব্যাক্তি ও সামাজিক পর্যায় এই পারস্পরিক স্বার্থের অধিক্রমণ (overlapping) ঘটে বলেই সহযোগী মনোভাব (cooperation) দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তাই যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

পরস্পর-নির্ভর বাজারবাদ (Inter-dependence Liberalism): পরস্পর-নির্ভর বাজারবাদীরা দ্রঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে বিশ্বব্যাপী আধুনিকায়ন বিভিন্ন দেশের মধ্যে পরস্পর নির্ভরতা বাড়াতে সাহায্য করবে। এই ব্যাক্তি-পর্যায়, সমাজ-পর্যায় এবং রাষ্ট্র-পর্যায় জটিল পরস্পর-নির্ভরতা কেন্দ্র করেই বিভিন্ন বহুজাতিক কর্পোরেশন বা বেসরকারি সংস্থার (মোদ্দা কথায় অর্থনৈতিক non-state actors) উত্থান ঘটছে এবং এরাই বৃহত্তর আঁকারে ব্যাবসা-বাণিজ্য করে উন্নত ও প্রগতিশীল পৃথিবী তৈরিতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখছে।[8] এমতাবস্থায় রাষ্ট্রিয় নিরাপত্তা অর্জনের জন্য সামরিক শক্তি খুব একটা কার্যকর কোন যন্ত্র (instrument) না, বরঞ্চ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং জনগণের কল্যাণ সাধনই রাষ্ট্রের মূল উপজীব্য। এর মানে গোটা বিশ্বব্যাপী সহযোগী মনোভাবাপন্ন রাষ্ট্রের উত্থান ঘটবে। যেমন: মাক্রোসফট (Microsoft), স্যামসাং (Samsung), ইউনিলিভার (Unilever) ইত্যাদি।

প্রাতিষ্ঠানিক বাজারবাদ (Institutional Liberalism): পরস্পর-নির্ভর বাজারবাদীরা যদি অর্থনীতিকে (পূজিকে) গুরত্ব দিয়ে থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক বাজারবাদীরা বিভিন্ন ধরণের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান (international institutions) বা আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান (regional institutions) প্রশাসনিক কার্যক্রমকে অধিকতর গুরত্ব দিয়ে থাকেন। এখন কথা হলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কি বা কাকে বলে? মূলত, বিভিন্ন ধরণের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন বা “Set of rules” আছে, যা সমগ্র্য সদস্য রাষ্ট্রদের মেনে চলতে হয়। এসব নিয়ম-কানুনকে কেন্দ্র করেই একটি আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা (international regime) গড়ে উঠে।[9] যেহেতু আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠে, একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সেখানকার সদস্য রাষ্ট্রের মাঝে মতৈক্য (commonality) এবং সুবিন্যস্ত নিয়মের প্রয়োগ (specificity) করে থাকে; আবার সেসব সদস্য রাষ্ট্রের উপর নির্ভর না করে নিজের স্বায়ত্তশাসন (autonomy)  বজায় রাখে।[10] এর ফলশ্রুতিতে সদস্য রাষ্ট্রের একে-অপরের প্রতি সন্দেহ ও বিশ্বাসহীনতা অনেকটাই কমে যায়, যেহেতু আন্তর্জাতিক শাসন কায়েম করছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। উদাহরণ: জাতিসংঘ (United Nations), আসিয়ান (ASEAN), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ইত্যাদি।

প্রজাতান্ত্রিক বাজারবাদ (Republican Liberalism): সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমান জাতিসংঘের পূর্বসূরী লিগ অব নেশন্সের (League of Nations) প্রতিষ্ঠাতা উড্রো উইলসনের বিখ্যাত ইংরেজি উক্তির বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কখনোই একে-ওপরের সাথে লড়াই করে না”। এখানে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন গণতন্ত্রের মহত্ত্বের কথা; কিভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। এখন অনেকেই উড্রো উইলসনের উক্তিকে আদর্শবাদী বাজারবাদের সাথে মিলিয়ে ফেলবেন এবং মিলিয়ে ফেলাই স্বাভাবিক। তবে প্রজাতান্ত্রিক বাজারবাদীদের গভীর বিশ্বাস এই যে, গণতান্ত্রিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সরকার যেহেতু নির্বাচন করে জনগণের ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতার গদিতে বসেন, তাঁরা নিজেদের সরকার টিকিয়ে রাখার সর্বাত্নক চেষ্টা করেন।[11] বিশেষ করে, অন্য রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ জড়ালে অর্থনীতিতে টানা-পোড়ণ পড়বে এবং জনগণ কষ্টে নিমজ্জিত হবে। সর্বোপরি, যুদ্ধ অনেক ব্যায়বহুল এবং রাষ্ট্রিয় কোষাগারে চাপ সৃষ্টি করে।[12] তাই নিজদের স্বার্থ (ক্ষমতায় আঁকরে থাকা) এবং জনগণের স্বার্থের (স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি) কথা চিন্তা করে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র সচারচর যুদ্ধে লিপ্ত হয় না।

বাজারবাদের সমালোচনা

বাজারবাদের সবচেয়ে বড় সমালোচক এবং প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী নব্য শক্তিবাদী (Neo Realists) ছাড়া মনে হয় কেউ নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তিকালে বাজারবাদের পূনরোত্থানের পর থেকেই নব্য শক্তিবাদীরা নানান ভাবে বাজারবাদীদের বেকায়দায় ফেলতে এবং বাজারবাদের অতি-আশাবাদী (optimistic) চিন্তাধারাকে ভুল প্রমাণ করতে যেন কোমড় বেধে নেমেছেন। নিম্নে তুলে ধরা হলো যেসব জায়গায় বাজারবাদের সাথে নব্য শক্তিবাদের তুমুল মতবিরোধ রয়েছে।

১) মানব প্রকৃতি (Human Nature): এটা নতুন খবর নয় যে গোটা শক্তিবাদী মহল সকল মানুষের মানব প্রকৃতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। যেখানে বাজারবাদীরা “মানবতা বরং সম্ভাবনাময়” বলে গলা ফাটিয়ে মরেন, নব্য শক্তিবাদীরা বারবার আঙুলে দিয়ে দেখিয়ে দেন মানুষের খলচরিত্রসূলভ রুপ। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে মিত্রতা স্থাপন করা এবং মূহুর্তের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা করে তা শত্রুতায় রূপ দেওয়া, এটা বাস্তববাদী চিন্তারই ফসল। যেখানে তার স্বার্থ আছে এবং তুলোনামূলক ভাবে বেশি লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সে তো সেখানেই যাবে। বাজারবাদীরা এখনো পর্যন্ত এর সদুত্তর দিতে পারেন নি এবং কেউ কেউ অকপটে স্বিকারও করেছেন বাজারবাদী চিন্তার এই বিশেষ দুর্বলতার জায়গার। এই জন্য সেসব বাজারবাদীদের তাচ্ছিল্যের সাথে “দুর্বল বাজারবাদী” (Weak Liberalist) আখ্যা দেওয়া হয়েছে কতিপয় শক্তিশালী বাজারবাদী (Strong Liberalist) দ্বারা।

২) পরম লাভ বনাম আপেক্ষিক লাভ: বাজারবাদীরা মনে করেন স্বার্থের জন্য হলেও মানুষ একে অপরের সাথে সহযোগীতা করবে, যার ফলে গোটা সমাজ ও দেশ উপকৃত হবে। এই জায়গাটিতেও নব্য শক্তিবাদীদের দ্বিমত রয়েছে। নব্য শক্তিবাদীরা পরম লাভ (Absolute Gain) এবং আপেক্ষিক লাভ (Relative Gain) নিয়ে চিন্তায় মশগুল থাকেন। এখানে পরম লাভ বলতে বুঝানো হয়েছে যে কাউকে সহযোগীতা করে আমার যা কিছুই হোক, সেটাই আমার লাভ (৭০%-৩০%)। আবার আপেক্ষিক লাভে বোঝানো হয়েছে যে কারোর সাথে সহযোগীতা করে আমার যদি তার অপেক্ষায় তুলনামূলক কম লাভ হয় (৫১%-৪৯%), সেদিক দিয়ে আমার ক্ষতিই হয়েছে। বাজারবাদীরা আদৌ তাঁদের দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরম লাভ এবং আপেক্ষিক লাভের বৈশিষ্টের জবাব দিতে পারেনি। তবে বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে সব দেশই আপেক্ষিক লাভ অর্জনের জন্য সোচ্চার থাকে এবং তারা একটি চুল পরিমাণ স্বার্থ বিসর্জন দিতে নারাজ।

৩) ব্যার্থ গণতন্ত্র বা প্রাজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র: খুব সম্ভবত পশ্চিমা বিশ্ব ছাড়া পৃথিবীতে আর কোথাও আদর্শ গণতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্রের চর্চা রয়েছে বলে মনে হয়না। আর যা গণতন্ত্র আছে সবই নামে-মাত্র। আদতে সেখানে গণতন্ত্রের নামে প্রহসন এবং স্বৈরাচারী সরকার ব্যবস্থা চালু আছে। আর এই জিনিসটি দিয়েই নব্য শক্তিবাদীরা বাজারবাদীদের খোঁটা দিয়ে থাকেন। বাজারবাদীদের গণতন্ত্রের দম্ভ এবং অহংকার নিমিষেই তখন মাটিতে মিশে যায়। আদতে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আদতে কোন সরকারই চাইবে না সে দেশের জনগণ দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের সময় বাধা হয়ে দাঁড়াক, যতোই খারাপ সেই স্বার্থের উদ্দেশ্য হোক। এমতাবস্থায় সরকার তখন নিজের কাছে কুক্ষিগত করে রাখে অগণতান্ত্রিকসূলভ আচরণ করে। এখানেও বাজারবাদের বিস্তর বাস্তবিক চিন্তার ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়।

উপসংহার

বাজারবাদ বা লিবারেলিজম চিন্তাধারা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শিক্ষায় যেমন নতুন মাত্রা যোগ করেছে, সেই সাথে শক্তিবাদী বা রিয়ালিজম চিন্তাধারার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। আদতে সবকিছুকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মানবজাতি আজ একবিংশ শতাব্দীর উন্নয়ন এবং জৌলুস কখনই ভোগ করতে পারতো না যদি না তারা একে-অপরকে সহযোগীতা করার জন্য সমাজব্যাবস্থা তৈরি না করতো। মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর এবং সেই ব্যাক্তি স্বার্থপরতাকে যদি পরস্পর স্বার্থে রূপান্তরিত করা সম্ভব, তাহলে আশাতীত মানব ও বৈশ্বিক উন্নয়ন সম্ভব। যুদ্ধ-অরাজকতা-ঘৃণা-বিদ্বেষ-অবিশ্বাস বিহীন বিশ্ব অবশ্যই তৈরি করা সম্ভব, যার তদবির বাজারবাদীরা প্রায়শই করে থাকে।

[1] Robert O. Keohane. 1989. International Institutions And State Power. Boulder, CO: Westview Press.

[2] Adam Hayes and Michael J. Boyle. 2021. “Adam Smith And “The Wealth Of Nations”. Investopedia. https://www.investopedia.com/updates/adam-smith-wealth-of-nations/.

[3] David Deudney and George J. Ikenberry. 1999. “The Nature And Sources Of Liberal International Order”. Review Of International Studies 25 (2): 179-196.

[4] Ibid, 179-196.

[5] Steven W. Hook. 2015. Democratic Peace In Theory And Practice. 4th ed. Ashland: Kent State University Press.

[6] U.S. Embassy in KR. 2022. “Woodrow Wilson: Fourteen Points Speech (1918)”. U.S. Embassy & Consulate In The Republic Of Korea. https://kr.usembassy.gov/education-culture/infopedia-usa/living-documents-american-history-democracy/woodrow-wilson-fourteen-points-speech-1918/.

[7] Jackson Sorensen. 2015. Classical Theories Of International Relations. Oxford: Oxford University Press.

[8] Ibid.

[9] Ibid.

[10] Ibid.

[11] Ibid.

[12] Ibid.

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured