Homeদক্ষিণ এশিয়াভাসানচরে স্থানান্তর না মিয়ানমারে স্থানান্তরঃ কোনটা জরুরি?

ভাসানচরে স্থানান্তর না মিয়ানমারে স্থানান্তরঃ কোনটা জরুরি?

অবশেষে নানা আলোচনা-সমালোচনার পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে কক্সবাজার আশ্রয় ক্যম্পে থাকা রোহিঙ্গা শরনার্থীদের কক্সবাজার শরনার্থী ক্যাম্প থেকে ১২৩ কিলমিটার দূরে নোয়াখালি জেলায় অবস্থিত ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত আশ্রয় কেন্দ্রে রোহিঙ্গা শরনার্থী স্থানান্তর প্রকৃয়া শুরু করেছে। গত শুক্রবার ৪/১২/২০২০ তারিখে ১৬৪২ জন রোহিঙ্গা শরনার্থী স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু হয় (সূত্র – বিবিসি বাংলা )।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সন্ত্রাস নির্মূল অভিযানের নামে সেই দেশের রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত সখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের উপর ব্যাপক নির্যাতন, গনহত্যা শুরু করে। উল্লেখ্য মিয়ানমানের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের  নাগরিক হিসেবে গন্য করা হয় না। মিয়ানমার সেনাবাহিনি কর্তৃক নির্যাতনের স্বীকার হয়ে  লক্ষ্যাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে আসতে থাকে। প্রথম দিকে বাংলাদেশ সীমান্তে কড়াকড়ি অবস্থান নিলেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনির নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে রাখাইনে পরিস্থিতির যখন আরও অবনতি ঘটতে থাকে তখন মানবিক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়। সীমান্ত খুলে দেয়ার ফলে আনুমানিক ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় গ্রহন করে। যা বর্তমানে ১০ লাখের অধিক রূপ নিয়েছে। ফলে কক্সবাজার রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্প বর্তমানে এই গ্রহের সবচেয়ে বড় শরনার্থী ক্যাম্পে পরিণত হয়েছে।

মিয়ানমার থেকে আগত এসব রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী জেলা কক্সবাজারে  বেশ কিছু  শরনার্থী শিবির স্থাপন করে আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। মানবিক দিক বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশকে এর জন্য কম খেসারতও দিতে হয় নি। রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র নির্মান করতে গিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলের পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। কক্সবাজারের বনভূমির একটা বিরাট অংশ ইতিমধ্যে উজার হয়ে গিয়েছে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে। ক্ষতির পরিমাণ হিসেবে যা অপূরনীয়। অন্যদিকে দীর্ঘদিন শরনার্থী ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে ক্যাম্পের আশে  পাশে বসবাসরত স্থানীয় জনগনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পরেছে। এরই মধ্যে রোহিঙ্গারা সেখানে বেশ কিছু হামলাও চালিয়েছে। এসব হামলায় স্থানীয় জনগনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনির সদস্যরা আহত এমনকি নিহত পর্যন্ত হয়েছে। এছাড়া ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গারা অনেকসময় নিজেদের মধ্যেই সংঘর্ষে জরিয়ে পরছে।  যার ফলে রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্প এবং  ক্যম্পের আশেপাশের আর্থ- সামাজিক, আইনসশৃঙ্খলা অবস্থার যথেষ্ট অবনতি হওয়ার পূর্ণ আশংকা তৈরী হচ্ছে। এছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শরনার্থী ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা যেভাবে বসবাস করছে সেখানে তাদের যথেষ্ট স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্ভাবনা রয়েছে। কেনোনা রোহিঙ্গাদের সংখ্যার তুলনায় শরনার্থী ক্যাম্পগুলোতে জায়গার অনেক স্বল্পতা রয়েছে। যার ফলে স্বল্পজায়গায় তাদেরকে গাদাগাদি করে মানবেতর জীবণ পার করতে হচ্ছে।

তাই সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সিদ্বান্ত নেয় যে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যম্প থেকে কিছু শরনার্থীদের নোয়াখালির ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত আশ্রয় কেন্দ্রে স্থানান্তর করার, যাতে করে রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের থেকে উন্নত পরিবেশে থাকতে পারে যতদিন না তারা নিজ দেশে ফেরত যাচ্ছে। কারণ কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জীবণ দিনদিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কেনোনা দিন যত গড়াচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করছে। গত ৩ বছরে আন্তর্জাতিক সপম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর জন্য উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো পদক্ষেপই নেয়া হয় নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মুখে বাংলাদেশের কাছে সবসময় বলে যাচ্ছে যে  তারা রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধান চায়। কিন্তু কার্যত এর জন্য কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে মিয়ানমারের উপর তেমন কোনো চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে না যাতে মিয়ানমার বাধ্য হয় রোহিঙ্গাদের পূর্ন নাগরিক মর্যাদা দিয়ে ফেরত নিতে। এর ফলে একদিকে মিয়ানমার এত বড় নির্মম মানবতাবিরোধী কাজ করেও রয়েছে কমফোর্ট জোনে অন্যদিকে বাংলাদেশকে ৩ বছর ধরে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে ১০ লাখের অধিক মানুষের ভরণপোষনের দায়িত্ব।

এই যখন অবস্থা তখন অবস্থা তখন বাংলাদেশ সিদ্বান্ত নেয় এই মাস থেকে কিছু রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তর করতে। এতে একদিকে যেমন রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের থেকে উন্নতভাবে থাকতে পারবে কেনোনা সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য রয়েছে পরিকল্পিত আবাসন ব্যাবস্থা, চিকিৎসাকেন্দ্র, বিদ্যালয়। সেখানে আরও রয়েছে মাছ চাষ, পশুপালনের ব্যাবস্থা যাতে করে রোহিঙ্গাদের কিছু আয়-রোজগার হতে পারে। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের ফলে কক্সবাজারে ক্যাম্পগুলো থেকেও কিছুটা চাপ কমবে। যা ঐ এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থা, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রখতেও সহায়ক হবে।

এখন বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ নিয়ে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মহল থেকে অভিযোগ করে বলা হচ্ছে যে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর প্রকৃয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে বার বার করে বলা হচ্ছে যে রোহিঙ্গাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চত করেই ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর স্বপক্ষে বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে বহু উপাত্বও ইতিমধ্যেই উপস্থাপন করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে ভাসানচর রোহিঙ্গাদের জন্য শতভাগ নিরাপদ। কিন্তু তা সত্বেও আন্তর্জাতিক মহল থেকে এর পূর্ণ সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে না। এখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বোধগম্য হওয়া উচিৎ যে বাংলাদেশের যদি রোহিঙ্গাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলার ইচ্ছা থাকত  তবে ২০১৭ সালের আগস্টে যখন মিয়ানমার রোহিঙ্গা নিধন অভিযান শুরু হয় তখন বাংলাদেশ তার সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিত না। তখন মিয়ানমারের পাশে অবস্থিত বাংলাদেশই একমাত্র দেশ ছিল যে লাখ লাখ নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাড়িয়েছিল। যেখানে অন্যান্য দেশগুলো অনেকটা নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। এটা সকলেরই জানা উচিৎ যে বাংলাদেশ সর্বদাই রোহিঙ্গাদের কল্যান চায়। বাংলাদেশ চায় রোহিঙ্গারা যেন পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা নিয়ে তাদের নিজ দেশে বসবাস করতে পারে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরেকটি বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরী যে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের চিরস্থায়ীভাবে থাকতে দেয়া হচ্ছে না। এটি শুধু কিছু সময়ের জন্য। কারণ রোহিঙ্গাদের শেষ ঠিকানা হচ্ছে রাখাইন।

সেই জন্য রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদান করার পরপরই বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরনার্থীর সমস্যাটির একটি গ্রহনযোগ্য এবং টেকসই সমাধানের জন্য কাজ করতে থাকে। যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ বারবার রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সোচ্চার হয়েছে। বাংলাদেশের সরকার যখনই অন্য দেশের সরকারের সাথে মিলিত হয়েছে তখনই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করেছে। ঢকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সাথেও বাংলাদেশ নিয়মিত আলোচনা করছে যাতে করে সেই সকল দেশ রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক মর্যাদায় রাখাইনে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ করে।

বাংলাদেশের তরফ থেকে এত কিছু করার পরও রোহিঙ্গা সমস্যার একটি স্থায়ী এবং টেকসই সমাধান যেন এখনো অধরাই থেকে যাচ্ছে। কেনোনা বাংলাদেশের একার পক্ষে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ইচ্ছা এবং আন্তরিকতা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এগিয়ে না এলে মিয়ানমার কখনোই রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখন ভাসানচরে স্থানান্তরের থেকেও রাখাইনে স্থানান্তর নিয়ে বেশি কাজ করা প্রয়োজন। কারণ ভাসানচরে স্থানান্তরের বিষয়টি হচ্ছে সাময়িক সময়ের জন্য। অন্যদিকে রাখাইনে স্থানান্তরে বিষয়টি হবে চিরস্থায়ী। আর রখাইনে স্থানান্তর নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাজ যত কম হবে ততই মিয়ানমারের জন্য সুবিধা হবে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার বিষটি এড়িয়ে যাওয়ার। এর ফলে রোহিঙ্গা সমস্যাটির সমাধানের পথটিও সরু হতে থাকবে। এতে করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে রোহিঙ্গারাই। কারণ গত ৩ বছর ধরে রোহিঙ্গারা অনিশ্চিৎ ভবিষ্যত নিয়ে শরনার্থী ক্যাম্পে স্টেটলেস হয়ে  দিন যাপন করছে। যার ফলে মানুষ হিসেবে যে কতগুলো অধিকার ভোগ করার করার কথা তাও রোহিঙ্গারা পারছে না। তাই অতি দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানে আসতে হবে। আর সেই স্থায়ী সমাধানটি হচ্ছে তাদের আদি নিবাস রাখাইনে ফেরত পাঠানো। এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা। সেই জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মূল ফোকাস ভাসানচরে স্থানান্তরের উপর  না হয়ে মূল ফোকাস হওয়া উচিৎ রাখাইনে স্থানান্তর উপর। কারণ রোহিঙ্গাদের একমাত্র গন্তব্য রাখাইন, ভাসানচর না।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured