Homeবাংলাদেশকোয়াড এবং ভ্যাকসিন কূটনীতি

কোয়াড এবং ভ্যাকসিন কূটনীতি

কোয়াড্রালেটারাল সিকিউিরিটি ডায়ালগে (কোয়াড) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত সদস্য৷ ২০০৭ সাল থেকে এই জোট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানকে নিয়ে কাজ শুরু করেছে এবং ২০১৭ সাল থেকে খুবই দ্রুতগতিতে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে নৌপথে চলাচল স্বাধীন ও নিরাপদ রাখার উপায় খুঁজতে এই জোট কাজ শুরু করে৷ প্রকাশ্যে এটাকে সামরিক জোট বলা না  হলেও এটা সামরিক জোট হিসেই কাজ করছে বলে  এই জোটকে তাই এশিয়ার ন্যাটোও বলা হচ্ছে৷ এটা কোয়াডের মূল লক্ষ্য হচ্ছে চীনের উদীয়মান অর্থনীতি ও বিশ্বে পরাশক্তি হিসেবে আত্নপ্রকাশ এবং ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন মহাসাগরে চীনের প্রভাব বিস্তারকে খর্ব করা। অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে “নব্য স্নায়ুযুদ্ধ” (New Cold War) হিসেবে অভিহিত করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীন দিন দিন পরাশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক সুরক্ষার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। এছাড়া চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শীতল মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছে। ভারত মহাসাগরের মালাক্কা প্রণালী, দক্ষিণ চীন সাগর, সামরিক, অর্থনৈতিক, হংকং- তাইয়ান ইস্যু, উইঘুর মুসলিম নির্যাতনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের ঠান্ডা লড়াই বেড়েই চলেছে। এই লড়াইয়ের অংশ হিসেবে চীনের প্রতিবেশী দেশগুলোর উপরও প্রভাব পড়বে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দুটি দেশ ভারত ও চীনের মধ্যে ভূকৌশলগত উত্তেজনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ব্রহ্মপুত্র  নদীর পানি ইস্যু সমস্যা, গলোয়ান উপত্যকা, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর, চীন ও ভারতের মাঝে অবস্থানরত দুটি দেশ নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে সীমান্ত সংঘর্ষ, ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তার, দক্ষিণ চীন সাগরে প্রভাব বাড়ানো, মালাক্কা প্রণালীতে আধিপত্য বিস্তার, দালাইলামা ইত্যাদি বিষয়ে চীনের সাথে ভারতের উত্তেজনা বর্তমানে চলছে।

চীনের সাথে জাপানেরও কৌশলগত দ্বন্দ্ব রয়েছে। উত্তর চীন সাগরের উপর আধিপত্য, চীন-জাপান যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, জাপানের সেনকাকু দ্বীপ নিয়ে বিরোধ, ইতিহাসগত দ্বন্দ্ব, তাইওয়ান ইস্যু, জাপান – আমেরিকা নিরাপত্তা সহযোগিতা, সামরিক অস্ত্র বিষয়কে কেন্দ্রকে করে বৈশ্বিক রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশ দ্বন্দ্বে লিপ্ত।

চীন বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে তার আধিপত্য বিস্তার করার জন্য। মাইক্রোনেশিয়া  দ্বীপপুঞ্জ, সামোয়া, ফিজি, ভানিয়াতু, ককেশাস অঞ্চল, টোঙা বেইজিংকে স্বীকৃতি দিয়েছে কিন্তু পালাউ, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, টুল্যাভু, কিরিবাতি তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া চীনের হস্তক্ষেপ মানতে নারাজ। এছাড়াও ভারত মহাসাগরের উপর আধিপত্য ও দক্ষিণ চীন সাগরের উপর আধিপত্য নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও চীনের মধ্যে দ্বন্দ্ব বিদ্যমান।

তাই চীনের সাথে বিবাদমান দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র কোয়াড গঠন করেছে। মূলত বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীনের আধিপত্য বিস্তারকে হ্রাস করা। চীনও যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেকানোর জন্য হিমালয় অঞ্চলের দেশ পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপালকে নিয়ে ” হিমালয়ান কোয়াড ” গঠন করার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে । আফগানিস্তানের সাথে যেহেতু ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বিদ্যমান, তাই আফগানিস্তানের সাথে চীন সুসম্পর্ক গড়ে তোলায় মনোযোগী হয়েছে। নেপালের সাথে ভারতর সীমান্ত সমস্যা নিয়ে বিরোধ থাকায় নেপালকে পাশে পাবে চীন। চীন এই দেশগুলোকে নিয়ে চীন মুক্তার মালা কৌশল ” প্রকল্প চালু করেছে। এছাড়া চীন বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলংকাকে নিয়ে একটি প্রকল্প চালু করেছে যেটি কোভিড পরবর্তী ভ্যাকসিন, ই- কর্মাস, দারিদ্র্য বিমোচন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাহায্য করবে।

চীন ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন দেওয়ার মাধ্যমে সাহায্য করেছে এবং কোয়াডে অংশগ্রহণ না করতে এক প্রকার কঠোর বার্তা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো যে, বাংলাদেশ যদি কোয়াডে অংশগ্রহণ করে তাহলে বাংলাদেশের কি লাভ বা ক্ষতি হবে?? বাংলাদেশ ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে ভারতের উপর নির্ভরশীল ছিল কিন্তু ভারত বাংলাদেশের প্রত্যাশিত ভ্যাকসিন দিতে পারিনি। করোনায় ভারতের অর্থনীতি ২৫বছর পিছিয়ে গেছে এবং স্বাস্থ্য খাত ভেঙে পড়েছে। তাই বাংলাদেশের উচিৎ চীনের সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করা। চীন যেহেতু বাংলাদেশের মেগা প্রকল্প পদ্মা সেতু, কর্ণফুলি টানেলসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে এবং তিস্তা পানি বন্টন চুক্তিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তাই বাংলাদেশের সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা দরকার। এছাড়াও চীনের দেওয়া ভ্যাকসিন বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর উপর প্রয়োগ করে করোনা স্বাাস্থ্য ঝুুঁকি কমানো যাবে। বাংলাদেশ যদি কোয়াডে অংশগ্রহণ করে তাহলে চীনের সাথে তার সম্পর্কে ভাটা পড়বে। চীনের বিনিয়োগ কমে যাবে, বাংলাদেশের সরকারের আয়ের উৎস কমবে, মেগা প্রকল্পগুলোতে উন্নয়নের গতিশীলতা কমে যাবে। ভ্যাকসিন কূটনীতির ক্ষেত্রে ভাটা পড়বে। এক কথায়, আর্থসামাজিক উন্নয়নের সূচকের বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে চলে যাবে। এছাড়াও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে এশিয়াতে বাংলাদেশের অবস্থান পূর্বের ন্যায় থাকবে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি বাংলাদেশকে কোয়াডে অংশগ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানায় তাহলে বাংলাদেশের আদৌ কোনো ক্ষতি হবে কি না তা বলা যাচ্ছে না। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক তেমন নেই। সামরিক কৌশলগত বা সামরিক ঘাটি, পারমাণবিক শক্তি খাতেও বাংলাদেশের সাথে মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা নেই। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েন সৃষ্টি হবে না।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured