Homeইতিহাসরবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ

রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ

জাতীয়তাবাদ সম্ভবত বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী আদর্শ। আমরা যে বিশ্বব্যবস্থায় বসবাস করি তার প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজেদের জাতীয়তাবাদী বলে দাবি করে। জার্মানি( জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা), ফ্রাস্ন, যুক্তরাজ্য কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মত রাষ্ট্রগুলো জাতীয়তাবাদী আদর্শের আগ্রদূত। জাতীয়তাবাদকে একটা আদর্শ বলছি কেননা জাতীয়তাবাদ জনগণকে সম্মিলিত করে, উদ্বুদ্ধ করে ভাষা, ধর্ম, ইতিহাস, সংস্কৃতি অথবা নৃতত্ত্বের ভিত্তিতে। যেমনঃ ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি হল ভাষা। অন্যদিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি হল ইতিহাস( কলোনিয়াল ইতিহাস)। পাকিস্তান বা অন্যান্য রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হল ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, জাতীয়তাবাদ যেমন বন্ধু সৃষ্টি করে তেমনি শত্রুও সৃষ্টি করে- জাতীয় স্বার্থ ও অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাশিয়ার ঐতিহাসিক শত্রুতার কথা আমরা জানি। আবার যুক্তরাষ্ট্রের পরম মিত্র রাষ্ট্র হিসেবে ফ্রাস্ন পরিচিত। স্বার্থের পরিবর্তনের সাথে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের ’বন্ধু’শত্রুতে পরিনত হতে পারে বা ‘শত্রু’ বন্ধুতে। বহিঃশত্রুর উপস্থিতি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকে দৃঢ় করে- এই মতামত বিজ্ঞজনের।

উপরোক্ত জাতীয়তাবাদ মূলত ইউরোপীয় বৈশিষ্ট্যের। রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ থেকে ভিন্ন, যদিও সংজ্ঞার দিক থেকে তারা একই। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ” জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মেলবন্ধনই জাতি”। রবীন্দ্রনাথের পার্থক্য এই জায়গায় যে, তিনি একই ভাষাভাষী কোন নৃতাত্ত্বিক বা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীকে জাতি হিসেবে মেনে নেন নি। তার কাছে জাতির ধারণাটি নির্দষ্ট কোন অঞ্চল, সংস্কৃতি বা ভাষার ভেতর আবধ্য থাকে না। মূলত, এই কবি সমগ্র মানবজাতিকে অখণ্ড হিসেবে দেখেছেন। এজন্য, অনেক পন্ডিত তাকে বিশ্বনাগরিকতাবাদী( Cosmopolitans ) বলেছেন।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের জানাচ্ছেন যে,’ জাতি’ বা জাতীয়তাবাদের ধারনাটি পাশ্চাত্য প্রসূত এবং বেশ আধুনিক।  রবীন্দ্রনাথ জোর দেন যে, জাতির মূল উদ্দেশ্য তার ’যান্ত্রিক যুক্তিবোধের’ ভেতর নিহিত। এখানে ‘ যান্ত্রিক যুক্তিবোধ বলতে বোঝানো হচ্ছে যে, মানুষ নিজেদের স্বার্থ সাধনের উদ্দেশ্যেই একত্রিত হয়ে জাতিরাষ্ট্র গঠন করে। রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্যের ‘জাতি’র( Nation) ধারনার বিপরীত ধারনা হিসেবে ‘ সমাজ’ বা ‘ স্বদেশি সমাজকে’ উপস্থাপন করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, সমাজ বা স্বদেশি সমাজের ভিত্তি হল ভালবাসা এবং পরষ্পর সহযোগিতা যা পাশ্চাত্যের জাতীয়তাবাদের মত স্বার্থবাদী নয়। এই ভারতীয় কবি পাশ্চাত্যের জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করে বলেন যে, ” জাতিরাষ্ট্রের আওতায় মানুষ সর্বনিন্ম স্তরের মানবিক ও আধ্যাত্বিক এবং এই জাতিরাষ্ট্রের উচ্চতর কোন লক্ষ্য নেই”। অন্যদিকে সমাজে  বসবাসরত মানুষের একে অন্যের সাথে সম্পর্ক প্রকৃতিগত এবং সামাজিক মিথস্ক্রীয়ার মাধ্যমেই মানুষ তার আদর্শকে খুজে নেয়। জাতীয়তাবাদের পন্ডিতেরা অবশ্য ঠাকুরের সাথে একমত প্রকাশ করেন না। তাদের যুক্তি এই যে, জাতিরাষ্ট্র তাদের জনগণকে নৈতিক বন্ধনে আবদ্ধ করে এবং কল্যান রাষ্ট্র গঠন করে।

রবীন্দ্রনাথ মূলত বিশ্বমানবতাবাদী। অর্থাৎ, বিশ্বের সকল কোনের সব মানষকেই তিনি সাম্যের চোখে দেখেন। তাই ঠাকুরের কাছে ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ মানুষকে বিভক্তকারী একটি মতবাদ। তিনি জাতীয়তাবাদীদের মতের বিরোধিতা করে বলেন যে, ” জাতীয়তাবাদ নৈতিক সত্যকে জাতিরাষ্ট্রের ক্ষুদ্র সীমানার ( Territory) ভেতর আবদ্ধ করে ফেলে। নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ এমন উক্তি করতেও  পিছপা হন নি, ” জাতীয়তাবাদ মানবজাতিকে বিভক্ত করার মত পাপকর্ম করে”।

রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের অনুপ্রেরণা হল ভারতীয় প্রাচীন ইতিহাসের শিক্ষা। ভারতীয় সভ্যতার বৈশিষ্ট্য হল একে অপরকে দমন নয়, একে অন্যের ভাব গ্রহন। উদাহরণস্বরূপ, মোগলরা দীর্ঘ চারশত বছর ভারতবর্ষ শাসন করেছে। কিন্তু তারা এদেশীয় মানুষের সাথে মিশে গিয়েছিল এবং মোগল সংস্কৃতি ভারতীয় বা বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। আর্য এবং এই অঞ্চলের মানুষের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছিল হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারোর মত সভ্যতা।  এই যে অন্যের ভাব গ্রহন করে শক্তিশালী হওয়ার ক্ষমতা ( Accumulation) এজন্য ঠাকুর ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে শ্রেষ্ঠ বলেছেন।

একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ভারতীয় উপমহাদেশর সামাজিক ব্যবস্থা রাজনৈতিক ব্যবস্থার থেকে সবসময় শক্তিশালী ছিল। অর্থাৎ,সমাজ মানুষকে বেশি নিয়ন্ত্রণ করেছে রাষ্ট্রের থেকে। এই যুক্তিতে, অন্যকে দমন বা শোষন করে প্রাচ্যের টিকে থাকার প্রয়োজন নেই। বরং, পারষ্পরিক সহযোগিতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধই ভারতীয় সমাজের ভিত্তি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured