Homeইতিহাসরাজনীতি, ধর্ম, উপনিবেশবাদ ও অন্যান্য

রাজনীতি, ধর্ম, উপনিবেশবাদ ও অন্যান্য

সাধারণ অর্থে ধর্ম, রাজনীতি, উপনিবেশবাদ এসব ভিন্ন ও স্বতন্ত্র প্রসঙ্গ হলেও ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এসবের মধ্যে যে অন্তর্গত মিল প্রতীয়মান,  সেই বিবেচনায় এদের একটিকে পাশকাটিয়ে অন্যদের আলোচনা এখানকার সমসাময়িক ঘটনা-পরিক্রমার মূলে যাওয়ার ক্ষেত্রে অসমীচীন। ঠিক একই কারনে, দীর্ঘদীন ধরে এখানকার রাজনীতির সাথে ধর্মের যে দহরম-মহরম এবং তার ফলাফলে যে ঘাত-প্রতিঘাতের জন্ম হয় তাতে উপনিবেশবাদের আলোচনা বারবার উহ্যই থেকে যায়।

দক্ষিণ এশিয়ার জনমানুষ শেষ ঔপনিবেশিক শক্তিকে বিদায় জানানোর সাত দশক পেরিয়ে গেলেও উপনিবেশবাদের অম্লমধুর স্মৃতি তাদের এখন অবধি আষ্টেপৃষ্টে আছে।  বিক্ষিপ্তভাবে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সময়ে নানান জাতের-ধাচের শাসন ব্যবস্থা এখানে জারি থাকলেও উত্তর-আধুনিক দৃষ্টিতে উপনিবেশবাদের সার্থক মঞ্চায়ন ও যবনিকাপাত ঘটেছে প্রায় দুইশত বৎসরের ব্রিটিশ শাসনামলে। কাঠামোর জামাবদলে নয়া কাঠামোয় মোড়া ব্যবস্থা কতটা তার অতীত পরাধীনতার শৃংখল ভেঙে উত্তর-উপনিবেশবাদকে ধারণ করতে পেরেছে তা কিঞ্চিৎ জবাবের আশায় অপেক্ষমান! তবে সেইসব অতীত অধ্যায়ের যা কিছু বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে স্কন্ধে চেপে আছে তার অগ্রভাগ জুড়ে আছে এখানকার রাজনৈতিক-সংস্কৃতির বিভাজন তত্ত্ব। অন্য কিছু দিয়ে এখানকার মনস্তত্ত্বে সংঘাতের বীজ বপন যত কঠিন ধর্মের দোহাইে ফলাফল ততটাই বিপরীতে এবং বলা যায়, একে সম্বল করে টিকে আছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি।  যা আসলে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা কাঠামোর টিকে থাকার মন্ত্র “ভাগ কর ও শাসন কর “ এর নতুন মোড়কায়নও বটে।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের ফলাফল ব্রিটিশদের ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষমতা কাঠামোয় নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে নিয়ে আসে এবং ফলস্বরূপ তারা ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিতে বিভাজনের ছুরি চালায়। তৎকালীন সময়ে ক্ষমতায় থাকা মুসলিমদের উপর শিক্ষা সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ভাবে চালানো হয় দমন-পীড়ন সহ নানা বৈষম্যমূলক নীতি এবং সমান্তরাল ভাবে ইংরেজ সহযোগিতার কারনে এগিয়ে যেতে থাকে হিন্দু সম্প্রদায়। হিন্দুরা যখন রাজনীতি সচেতন হয়ে ব্রিটিশ শাসনের জন্য হুমকি হয়ে উঠল ঠিক তখনই আবার পরিবর্তন হল নীতি। কংগ্রেসের ধীরে ধীরে সর্ব ভারতীয় সংগঠন হয়ে উঠা ঠেকাতে ব্রিটিশ শাসকরা মুসলমানদের জন্য উদারতার দরজা খুলে দিলে গড়ে উঠল মুসলিম লীগ। এহেন বিভাজনে মুসলিম-হিন্দু সম্প্রদায় পূর্বের সম্প্রীতি ছেরে আলাদা আলাদা জাতি ভাবা শুরু করল নিজেদের, তৈরি হল সন্দেহের উদ্বেগ যার চূড়ান্ত পেরেক ১৯০৫ সালে ভাইসরয় লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের আদেশ। ঐ সময় পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জন্য এই সিদ্ধান্ত আশির্বাদই ছিল বটে তবে এর পিছনে কাজ করেছে দুই ধর্মের আন্তঃসম্পর্কের আস্থায় ফাটল ধরানো। কলকাতা বিশেষত হিন্দুদের প্রতিবাদের মুখে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয় আবার কিন্তু মুসলমানরা এটাকে দেখল তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে যার ফল ১৯৪৭ এর ভারতভাগ। দক্ষিণ এশিয়া থেকে এরপর উপনিবেশবাদ বিদায় নিলেও তার বিষবৃক্ষ এখানকার রাজনৈতিক-সংস্কৃতির গতিপথ অদৃশ্যে থেকে নির্ধারন করে চলেছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় এরপরের বিউপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ায় বারবার এই প্রশ্ন সামনে এসেছে যে রাজনীতিতে ধর্ম থাকবে কিনা? এবং বরাবরই একে উপজীব্য করে এখানকার রাজনীতি, রাজনৈতিক দল গনমনে নিজেদের আবশ্যকতা জারি রেখেছে। ভারতের স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন জাতীয় কংগ্রেস ধর্ম নিরপেক্ষতার ঝান্ডা উড়িয়ে ক্ষমতায় টিকে ছিলো, কিন্তু তাদের সেই নীতির কি বাস্তব কোন প্রয়োগ ছিল? নাকি পুরোটাই ভোটের রাজনীতি? সে প্রশ্নের সোজাসাপ্টা জবাব বিজেপির উত্থান। অনেকেই তাদের কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কড়া সমালোচনা করলেও বাস্তবতা হচ্ছে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের ভোটেই নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় টিকে আছেন। অন্যদিকে, বিজেপির “আইডেন্টিটি পলিটিক্সের” প্রতিক্রিয়ায় মুসলিমরাও স্বতন্ত্র পরিচয় খুঁজছেন যার প্রমান আসাদুদ্দিন ওয়াইসির নেতৃত্বাধীন মজলিশে-এ-ইত্তেহাদুল মুসলেমিন (মিম)। বিরোধীরা একে বিজেপির বি টিমের তকমা দিলেও বাস্তবতা হল হায়দ্রাবাদের ছোট খাটো এই দলকে সারা ভারতের মুসলমানরা এখন নিজেদের প্রতিনিধি ভাবতে শুরু করেছে। যার কারনে বিহারের সাফল্যের পর তারা এখন ছুটছে পশ্চিমবঙ্গের দিকে যা ইতিমধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃনমূলের জন্য যথেষ্ট চিন্তার কারণ। বলা বাহুল্য ভারতের রাজনীতির এই ধর্ম ভিত্তিক মেরুকরণ সামনের দিনের জন্য সংঘাতের বার্তাই বেশি দেয়।

সমস্যা হচ্ছে রাজনীতিবিদ, তাত্ত্বিক উভয়শ্রেনিই এই সমস্যার মূলের দিকে না গিয়ে বরং একে জিয়িয়ে রাখছেন একপ্রকারে বিরোধী পক্ষকে উষ্কে দিয়ে, তাতে নতুনকরে আইডেন্টিটি পলিটিক্স বাড়ছে এবং “স্টাটাস-কো পাওয়ার” একে দমন করে নিজেদের লেজিটিমেসি ধরে রাখছে। বাংলাদেশে রাজনীতিও সামনের দিনে কোথায় গিয়ে দাড়াবে তা ঠিক এই সূত্র অনুসরণ করলেই ধরা যায়।

প্রসঙ্গক্রমে, সাবঅলটার্ন স্টাডিজের মতে ‘মার্কসবাদ বলতে চেয়েছে ধর্ম মানুষকে পশ্চাৎপদ করে রাখে, অথচ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বলা যায় ধর্ম মানুষকে সামনের দিকে নিয়ে গিয়েছে (১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের শুরু ধর্মীয় মূল্যবোধের জায়গা থেকে যা পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাষনের গদি কাঁপিয়ে দিয়েছিল)’।

উপমহাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম থাকা না থাকা নিয়ে যে বিতর্ক তার দিকে যাবার আগে ভাবা উচিত ধর্ম কেন এখানে মুখ্য? দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক শাসনে বঞ্চিত, নিপীড়িত জনগন সহযেই কংগ্রেস-মুসলিম লীগের মধ্যে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছে পাশাপাশি এর মাধ্যমে তারা বিভাজনের (ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি) রেখায়ও পা দিয়েছে। ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর তাই মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসের থাকা নিষ্প্রয়োজন মনে করেছেন। দুঃখজনক ব্যাপার হল এরপর ক্ষমতায় থাকা অধিক সুবিধাজনক হওয়ায় তা আর হয়ে ওঠে নাই। বরং এই সংকট নিরসনের জন্য, দায়ী ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার ভুল না শুধরিয়ে, উপমহাদেশের জনগনের অতীত তিক্ত অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে রাজনীতি হয়েছে বারবার।

RELATED ARTICLES

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured