Homeতত্ত্বশক্তিবাদ বা রিয়েলিজমের প্রাথমিক পাঠ

শক্তিবাদ বা রিয়েলিজমের প্রাথমিক পাঠ

ভূমিকা

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ডিসিপ্লিনে “শক্তিবাদ”, যা ইংরেজি ভাষায় রিয়েলিজম (Realism) নামেই অধিক পরিচিত,  প্রধাণত আন্তঃরাষ্ট্রীয়  প্রতিযোগিতামূলক ও সংঘাতপূর্ণ ঘটনাবলিতে গুরুত্বারোপ করে। মানবসভ্যতার ঊষালগ্নের ঐতিহাসিক লেখাগুলিতেও শক্তিবাদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, সুনির্দিষ্টভাবে থুসিডাইডিসের (Thucydides) পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধের ইতিহাসে (খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১ থেকে ৪০৪ অব্দ)। প্রায় আড়াই হাজার বছর পুরনো থুসিডাইডিসের রচনাটিকে কেতাবিভাবে শক্তিবাদের স্বীকৃতি দেয়া হয় না, কারণ বিংশ শতাব্দী অবধি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নামকরণ হয়নি। সমসাময়িক ধ্যান – ধারণার তাত্ত্বিকগণ প্রাচীন এবং আধুনিক বিশ্বের শক্তিবাদ  সম্পর্কিত চিন্তার ধরণ ও আচরণে প্রচুর সাদৃশ্য পেয়েছেন। গবেষকবৃন্দ  থুসিডাইডিসের বই সহ বিভিন্ন লেখা থেকে একটি ধারণার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং এই কালজয়ী ধারণটিকে   “শক্তিবাদ” হিসেবে অভিহিত করা হয়।  

শক্তিবাদের মূলতত্ত্ব

প্রথমত, শক্তিতত্ত্বে রাষ্ট্র (State) হলো প্রধান চলক (Actor) এবং ব্যক্তি (Individual) কিংবা সংগঠন (Organisation) সীমিত আকারের চলক।  দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র একটি একক চলক (Unitary Actor)।   জাতীয় স্বার্থে (National Interest) – বিশেষত যুদ্ধের সময়ে রাষ্ট্রের সকলকে কথায়, কাজে ও নেতৃত্বে এক হয়ে থাকতে হয়। তৃতীয়ত, বুদ্ধিদীপ্ত বাস্তবতাসম্পন্ন যৌক্তিক সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে বিধায় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নেতা/ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ (Decision Makers) হলেন বুদ্ধিবৃত্তিক চলক (Rational Actor) । বিভিন্ন সংকটজনক পরিস্থিতিতে ভুল সিদ্ধান্ত  রাষ্টকে  দুর্বল করে তোলে। শক্তিতত্ত্বে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব ব্যবস্থায় টিকে থাকার জন্যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব  বিষয়ক প্রশ্নে সকল রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে।  চতুর্থত, বিশ্ব একটি অরাজক (Anarchy)  ব্যবস্থা,  এখানে কোন কেন্দ্রাতিগ কর্তৃপক্ষ ( Supranational Authority) নেই।  প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব পুলিশ বাহিনী, সেনাবাহিনী, আদালত সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো  প্রয়োজন অনুযায়ী কার্য সম্পাদন করে। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত উচ্চক্রম (Hierarchy)   না থাকায় প্রতিটি  রাষ্ট্রকে চূড়ান্তভাবে কেবল নিজের উপরেই নির্ভর করতে হয়।

চিত্র-১: শক্তিবাদের পথিকৃৎ।

শক্তিবাদ  অতীত ইতিহাস ঘেঁটে  মানবচরিত্রের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণে আগ্রহী। মানুষ প্রকৃতিগতভাবে পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ দৃঢ়তার সাথে করে। অর্থাৎ মানুষ অহংকারী এবং ক্ষমতালোভী।  শক্তিবাদগণ বিশ্বাস করেন যে মানুষের স্বার্থপরতা, ক্ষমতার লোভ এবং অন্যের  উপর আস্থা রাখার  অক্ষমতা  ইতিহাস জুড়ে এত যুদ্ধের সাধারণ কারণ। সংগঠিত জনসাধারণের (Individuals) দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রের আচরণে প্রভাব ফেলে। মানব চরিত্র কীভাবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে সে বিষয়ে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি আলোকপাত করেন। তাঁর সময়ে  রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিলো পুরুষতান্ত্রিক এবং এই  লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত রাজনীতির শক্তিতাত্ত্বিক বিবরণকে বহুলাংশে প্রভাবিত করেছে। ১৫১০ সালে রচিত দ্য প্রিন্স গ্রন্থে ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, একজন নেতার প্রাথমিক উদ্বেগ থাকা  উচিত জাতীয় সুরক্ষা (National Security) বিষয়ে।   সফলভাবে জাতীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে, নেতাকে সতর্কভাবে  অভ্যন্তরীণ এবং বহিরাগত হুমকি  কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হবে। একজন নেতা সিংহের মতো শক্তিশালী এবং শিয়ালের মতো ধূর্ত হবেন।  ম্যাকিয়াভেলির দৃষ্টিতে, কোন নেতা প্রচলিত ধর্মীয় নৈতিকতার চেয়ে ‘দায়িত্বের নৈতিকতা’ মেনে চলবেন। অর্থাৎ, নেতা ব্যক্তিজীবনে সৎ-ধার্মিক-অহিংস হতে পারেন তবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সহিংসতা ও কপটতার পথ বেছে নিতে প্রস্তুত থাকতে হবে।

শক্তিবাদের গোড়াপত্তন এবং উত্থান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে  ১৯৪৮ সালের দিকে হান্স মর্গানথৌ (Hans Morganthau) একটি বিসতৃত আন্তর্জাতিক তত্ত্ব  প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ জীবনের মতো রাজনীতিও আইন দ্বারা পরিচালনা করা সম্ভব।  তাঁর গবেষণায়  ফুঁটে  উঠেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্বার্থ (Interest) ও নৈতিকতার (Morality) মধ্যকার সম্পর্ক এবং গবেষণাটি  থুসিডাইডিস ও ম্যাকিয়াভেলি কর্তৃক প্রভাবিত।  আশাবাদী (Optimistic) – আদর্শবাদী (Idealist) মানুষজন সদিচ্ছা (Goodwill) দ্বারা  উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশা করেছিলেন  কিন্তু মর্গানথৌ  নৈতিকতার (Morality) চেয়ে শক্তি বা ক্ষমতার (Power) উপর বেশি গুরুত্ব প্রদান করেন। নীতি নির্ধারণে (Policy Making) নৈতিকতা  এড়ানো উচিত।  মর্গানথৌ এর  মতে, প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ শক্তি (power) কেন্দ্রীক। এক্ষেত্রে শক্তি (power) বজায় রাখা, বৃদ্ধি করা ও প্রদর্শনের  অনুসঙ্গ। নৈতিকতা (Morality) বা আদর্শবাদের (idealism) ভিত্তিতে প্রণীত রাষ্ট্রনীতি একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল বানিয়ে ফেলে। এই সুযোগে অন্য প্রতিযোগী রাষ্ট্র, আদর্শবাদী রাষ্ট্রটিতে  আধিপত্য বিস্তার করতেতে পারে কিংবা  ধ্বংসও করে ফেলতে পারে। জাতীয় স্বার্থ (National Interest) নৈতিক চেতনা বর্জিত (immoral) । বস্তুত, জাতীয় স্বার্থ নৈতিকতা (morality) পরিমাপের কোন বিষয় নয়।

নব্যশক্তিবাদের আগমন

কেনেথ ওয়াল্টজ শক্তিবাদ কে  পরিমার্জিত করে অধুনা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁর গবেষণার পূর্বে শক্তিবাদ  মানব প্রকৃতি/ চরিত্রের (human nature) মাধ্যমেই নিরূপিত হতো যা অবৈজ্ঞানিক,  অনুমান নির্ভর এবং ইতিহাস আশ্রিত। ওয়াল্টজ’র তাত্ত্বিক অবদানকে বলা হয় “নব্য শক্তিবাদ” (Neo Realism), কেউ কেউ আবার তাকে  “কাঠামোবদ্ধ শক্তিবাদ” (Structural Realism) বলেও অভিহিত করেছেন । একটি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত এবং কর্মপরিকল্পনা  মানুষের প্রকৃতির (Human Nature) উপর ভিত্তি করে হওয়ার পরিবর্তে,  একটি সাধারণ সূত্রের মাধ্যমে নেয়া উচিত।

চিত্র-২: নিও রিয়েলিজম তথা নব্য শক্তিবাদ তত্ত্বের লেভেল অব এনালিসিস (Level of Analysis)।

প্রথমত, সমস্ত রাষ্ট্র একটি আন্তর্জাতিক নৈরাজ্য (Anarchy)  ব্যবস্থায় বিদ্যমান। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি রাষ্ট্র যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে তাদের আপেক্ষিক শক্তির তুলনা করে।  সুতরাং, ওয়াল্টজ বিশ্ব ব্যবস্থায় (International System) শক্তিবাদের একটি নতুন  সংস্করণ প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি মানব প্রকৃতির ত্রুটি অনুসন্ধান করে রাজনৈতিক – দার্শনিক পদ্ধতির পরিবর্তে  সমাজ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে  বিশ্ব ব্যবস্থার নানা বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করতে সুপারিশ করেছিলেন। সমাজ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যাখ্যায় কিছু উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে, ওয়াল্টজ যেগুলোকে বলছেন চলক (Variable)।  যেমন কিছু চলকের  উদাহরণ –  নৈরাজ্য/ বিশৃঙ্খলা (Anarchy),  একটি রাষ্ট্রের কত ক্ষমতা (Power) ইত্যাদি।

[বোঝার সুবিধার্থে : চলমান বিশ্বে যা কিছু ঘটছে, যা কিছু বর্তমান সব কিছুই বিশ্ব ব্যবস্থা (international system) । বিশ্বে নানা রকম টানাপোড়েন, সমস্যা- সংকট, যুদ্ধ-বিবাদকে নৈরাজ্য/বিশৃঙ্খলা (anarchy)  বলা হচ্ছে। আর চলক (variable)  বলতে বোঝানো হচ্ছে বিশ্ব ব্যবস্থায় বিদ্যমান বিভিন্ন ‘উপাদান’কে।]

শক্তির ভারসাম্য

বিশ্ব পরিচালনায় শক্তিবাদের কেন্দ্রীয় কৌশলগুলির একটি – “শক্তির ভারসাম্য” (Balance Of Power) নামক ধারণা বা Concept। প্রতিটি রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত নিজেদের শক্তি বৃদ্ধিতে  নজর  দেয়।  একইসাথে অন্য রাষ্ট্রের শক্তি ও সক্ষমতা  কমাতে চেষ্টা করে। বিশ্ব ব্যবস্থায় (International  System) কোন রাষ্ট্রই অন্য রাষ্ট্রকে অত্যধিক ক্ষমতাশালী হতে দেয় না। তবুও কোন রাষ্ট যদি হিটলারের জার্মানির মতো শক্তি অর্জন করে তবে অন্য রাষ্ট্রসমূহ জোটবদ্ধভাবে যুদ্ধের মাধ্যমে সেই রাষ্ট্রকে পরাজিত করে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখে।   বিশ্ব ব্যবস্থা  বিশৃঙ্খল (Anarchic) হওয়ার  পেছনে  শক্তির ভারসাম্যহীনতা  দায় কম নয়। কোন একক রাষ্ট্র  স্বতন্ত্রভাবে বৈশ্বিক শক্তি  (Global Power)   হতে এবং বিশ্বকে তার প্রত্যক্ষ শাসনে  আনতে সক্ষম হয়নি। 

চিত্র-৩: অনেকগুলো তুলনামূলক দূর্বল রাষ্ট্র একত্রিত হয়ে একটি প্রবল ক্ষমতাধর রাষ্ট্রকে রূখে দিতে পারবে শক্তির ভারসাম্য তত্ব অনুযায়ী।

এজন্যে শক্তিবাদ  বারংবার  নমনীয় জোট গঠনে গুরুত্বারোপ  করে।  এই জোটগুলি রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক/ সাংস্কৃতিক সাদৃশ্যের ভিত্তিতে কিংবা ‘আমার শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’  –  এই সূত্রের মাধ্যমেও হতে পারে। ঠিক একারণেই  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন মিত্রতা করেছিলো।  উভয় দেশ জার্মানির উত্থানকে  হুমকি স্বরূপ দেখেছিল এবং যুদ্ধের মাধ্যমে  ভারসাম্য এনেছিলো।  কিন্তু যুদ্ধ শেষে দেশদ্বয় একে অপরের   আরও বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়   এবং স্নায়ুযুদ্ধকালীন (Cold War) শক্তির ভারসাম্য নতুন সমীকরণে পরিবর্তিত  হয় ।  শক্তিতাত্ত্বিকেরা ক্ষমতার ভারসাম্যকে (Balance Of Power) নৈরাজ্যপূর্ণ (Anarchic)  বিশ্ব পরিচালনার বিচক্ষণ কৌশল হিসাবে বর্ণনা করলেও সমালোচকেরা এই ধারণাকে  যুদ্ধ এবং আগ্রাসন (War And Aggression)  বৈধ করার হাতিয়ার হিসাবে দেখেন।

শক্তিবাদের স্বার্থকতা/বিশেষত্ব  

শক্তিবাদগণের  বিশ্বাস, শক্তিবাদ বিশ্বরাজনীতিকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে। এজন্যে, শক্তিবাদ  একটি স্বতন্ত্র তত্ত্ব (theory) অপেক্ষা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অধিক ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন কৌটিল্য ও ম্যাকিয়াভেলি তাঁদের রাজাদের জন্যে করণীয় নির্ধারণ করতেন কিন্তু বর্তমানে এসব শক্তিবাদের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। সমালোচকদের যুক্তিতে এই তত্ত্ব  বিশ্বকে স্থায়ীভাবে  সহিংস ও উগ্র করতে পারে।  মানবজাতির (Humankind) অসহযোগিতামূলক (Uncooperative) – দম্ভপূর্ণ (Egoistic)  মানসিকতা  ও রাষ্ট্রাতিগ শক্তির (Supranational Power) অনুপস্থিতি  শক্তিতাত্ত্বিক নেতাদের সন্দেহ, শক্তি এবং যুদ্ধের নীতি গ্রহণে উৎসাহী করে তোলে। শক্তিবাদ কে প্রায়শ অতিরিক্ত হতাশাবাদী (Pessimistic) বলে সমালোচনা করা হয় কারণ এটি বিশ্ব ব্যবস্থার দ্বন্দ্বমূলক প্রকৃতিকে অনিবার্য হিসেবে দেখে। শক্তিতাত্ত্বিকদের মতে, রাষ্ট্রনেতারা সীমাহীন সীমাবদ্ধতায়  সীমিত সহযোগিতার সুযোগ পেয়ে থাকেন। তাই  ক্ষমতার রাজনীতির বাস্তবতাকে তারা কোনভাবেই উপেক্ষা করতে পারেন না। অন্যভাবে একজন শক্তিতাত্ত্বিকের জন্যে,  নৈরাজ্যপূর্ণ  বাস্তবতার (Anarchic Reality) মুখোমুখি হওয়া হতাশাবাদ (Pessimism) নয় বরং বিচক্ষণতা। শক্তিবাদগণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কে শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে দেখেন ক্ষীণ দৃষ্টিতে এবং একজন রাষ্ট্রনেতার আদর্শবাদী (Idealistic) ভাবনা-চেতনাকে দেখেন বোকামি হিসেবে।

শক্তিবাদ কে পুনরাবৃত্তিমূলক  এবং আচরণগত একটি কালজয়ী ছক (Pattern)  হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিলো। [এখানে, পুনরাবৃত্তিমূলক  এবং আচরণগত বলতে বোঝানো হয়েছে  মানুষ সবসময় প্রতিহিংসাপরায়ণ, দাম্ভিক ও যুদ্ধবাজ তাই ইতিহাসে বারবার ক্ষমতার লড়াই হয়েছে এবং এই ঘটনাগুলো ব্যাখ্যার সহজ একটি ছক/ সূত্রের নাম শক্তিবাদ ]    কিন্তু শীতল যুদ্ধের (cold war) অবসান হলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। রাষ্ট্রসমূহ প্রতিযোগিতা নয় সহযোগিতার বাতাবরণ সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করে।  এই রূপান্তর (Transformation) একটি আশাবাদী (Optimistic) দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভব ঘটায় যা শক্তিবাদ কে ‘সেকেলে ভাবনা’র  (Old Thinking)  তকমা দেয়। শক্তিবাদ  – রাষ্ট্র (State), ক্ষমতা (Power), যুদ্ধ (War)  ইত্যাদি বিষয়ে প্রয়োজনের অধিক নজর দিলেও সহযোগিতা (Cooperation), বিশ্বায়ন (Globalisation)  এমন বিষয়গুলো সম্পর্কে উদাসীন। এই তত্ত্বে সাধারণ জনগণের (Ordinary Citizens) ,  বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার (International Organisations)  সক্ষমতাকে ধর্তব্যে নেয়া হয় না কারণ শক্তিবাদ  কেবল ও কেবল রাষ্ট্রকেন্দ্রিক (State Centric)  চিন্তা দোষে দুষ্ট।  স্নায়ুযুদ্ধ (Cold War) সমাপ্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ সোভিয়েত-নিয়ন্ত্রিত  পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলির সাধারণ জনগণের (Ordinary Citizens)  তৎকালীন শক্তি কাঠামোর (Power Structure) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ।  এই বিদ্রোহ এক দেশ থেকে অন্য দেশে বিস্তৃত হয়ে ১৯৮৯ – ১৯৯১ সালের মধ্যে সুবিশাল সোভিয়েত ইউনিয়ন  ক্রমান্বয়ে ভেঙে পড়ে। শক্তিতাত্ত্বিকরা সমালোচনার (Criticism)  গুরুত্বকে দায়সারাভাবে  স্বীকার করে, তাই সোভিয়েত রাশিয়ার  পতনের মতো বড় ঘটনাকে তত্ত্বের একটি  ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে দেখে।

উপসংহার

শক্তিবাদ   আন্তর্জাতিক রাজনীতির শক্তি প্রদর্শন কেন্দ্রীক বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে। এটি মানুষের অহংসুলভ আচরণ এবং একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ঊর্ধ্বে কোন রাষ্ট্রাতিগ কর্তৃত্বের (Supranational Authority) অনুপস্থিতি থেকে সংঘটিত সংকীর্ণ – সীমাবদ্ধ রাজনীতিগুলোকে তুলে ধরে।  শক্তিতাত্ত্বিকদের মতে, রাষ্ট্রহিতের জন্যে নৈতিকতা বর্জিত সিদ্ধান্ত দূষণীয় নয়; কেননা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ লক্ষ্য সার্বভৌম  থাকা। শক্তিবাদের আধিপত্য   নানাবিধ সমালোচনার জন্ম দিলেও, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়নকারীদের কাছে বিভিন্ন মূল্যবান ও সুচারু বিশ্লেষণের হাতিয়ার  হিসাবে এখনো প্রচণ্ডভাবে প্রাসঙ্গিক রয়েছে। 

RELATED ARTICLES

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured