Homeইউরোপের ইতিহাসহিটলারবিহীন পৃথিবী: কেমন হতে পারতো বিশ্বব্যবস্থা?

হিটলারবিহীন পৃথিবী: কেমন হতে পারতো বিশ্বব্যবস্থা?

এডলফ হিটলার, যার নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াল ধ্বংসযজ্ঞ এবং নির্বিচারে নিরস্ত্র ইহুদিদের উপর হলোকাস্ট তথা গণহত্যা চালানো। তিনিই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত ও অপমানিত জার্মানিকে একাই টেনে তুলেছিলেন, দেখিয়েছিলেন সামনে এগিয়ে যাবার পথচলা। তাই বলাই যায় হিটলার কিছু শ্রেণীর মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার নাম; আবার অনেকের কাছে একটি নরপিশাচ, বর্ণবাদী এবং ইহুদি নিধনে বদ্ধপরিকর একগুয়ে স্বৈরশাসক। কিন্তু এক হাতে তালি কখনো বাজে না। নিশ্চয়ই উনার জীবনের  এমন কিছু ঘটেছিলো যার কারণে তিনি এতোটাই পথভ্রষ্ট ও অমানবিক হয়ে পড়েছিলেন। বিশেষ করে, কিছু কিছু ঘটনা না ঘটলে হয়তো আমরা কোনদিনো এমন নরপিশাচের দেখা পেতাম না।

হিটলারের জন্ম অস্ট্রিয়ার খুব সাদামাটা একটা পরিবারে, ১৮৮৯ সালে। উঠতি বয়সে তার মধ্যেও অনেক স্বপ্ন ছিলো একজন শিল্পি ও ভাস্কর হবেন। এই জন্য ২০ বছর বয়সে ১৯০৯ সালে অস্ট্র-হাঙেরিয় সম্রাজ্যের রাজধানী ভিয়েনাতে পারি জমান ভিয়েনার প্রসিদ্ধ আর্ট কলেজে ভর্তি হতে। কিন্তু উনার কপাল এতোই খারাপ, সেই বিশ্বখ্যাত আর্ট কলেজে শুধুমাত্র আভিজাত্যরাই ভর্তি হতে পারতো। আবার তাদের রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মাবল্বীও হতে হতো। হিটলার না ছিলো কোনো অভিজাত বংশের বা রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান, তাই তাঁকে সেই কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগই দেওয়া হয়নি। যদিও তাঁর শৈল্পিক মেধা কোন অংশে কম ছিলো না। এখন ভাবুন, হিটলার সেই আর্ট কলেজে ভর্তি হলে সারা দুনিয়া কেমন হতো?

হিটলার তাঁর আত্নজীবনী মেইন কাম্ফে (Mein Kampf) বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছেন কিভাবে ইহুদিরা জার্মানির তিন-চতুর্থাংশ অর্থনীতি নিজেদের কাছে কুক্ষিগত করে রেখেছিলো এবং প্রায়সই অর্থের বিনিময়ে বহিঃশত্রুদের নিকট জার্মানির গোপন তথ্যাদি বিক্রি করে দিতো। এ থেকে অনেকে স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করতে পারেন যে হিটলারের ইহুদি-বিদ্বেষের মূল কারণ। কিন্তু আদতে এর চেয়েও আরো গভীর কারণ রয়েছে। ধারণা করা হয়,  হিটলার যখন ভিয়েনার প্রশিদ্ধ আর্ট কলেজে ভর্তি হতে না পেরে ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন শহরে, এমন সময় তিনি একটি সুদর্শণা সোনালী কেশের মেয়ের প্রেমে পড়ে যান। কিন্তু সেই মেয়েটির পরিবার ছিলো খুবই রক্ষণশীল ইহুদি, খ্রিস্টানদের সাথে উঠাবসা করতো না বললেই চলে। হিটলার তাকে নানান সময় অনেক চিরকুট পাঠাতো, আবার মেয়েটিও ভদ্রতার বশে সেগুলার উত্তর দিতো। এভাবে কয়েক মাস চলার পর  হিটলার একদিন বিরহের তর সইতে না পেরে মেয়েটির সাথে দেখা করার জন্য চিরকুত সমেত তাঁর প্রিয় কুকুরকে পাঠিয়ে দিলেন। দিন যায়, রাত যায়, এভাবে করে চার দিন কেটে যায়। সেই কুকুরটি যখন চার দিনেও ফিরে আসলো না, হিটলার তখন সাহস করে নিজেই সেই মেয়েটার বাড়িতে গেলেন আর দেখলেন ওই মেয়েটার বাড়ির চাকর গর্ত খোড়ার জন্য লোক খুঁজছে এবং আওরাতে লাগলেন যে গর্ত খুঁড়ে দেওয়ার জন্য টাকা দেওয়া হবে। হিটলার এটা শুনা মাত্রই কাজ করতে রাজি হয়ে গেলেন। গর্ত খোঁড়ার পর যখন দেখলেন একটা বস্তা দাফন করতে হবে, তিনি সাথে সাথে চমকে উঠলেন যখন সেই বস্তা থেকে রক্তাক্ত এক কুকুরের লেজ বেড় হয়ে আছে। হিটলারের বুঝতে একটুও বাকি রইলো না তাঁর প্রিয় কুকুরের মৃত্যুর সেই ইহুদি মেয়েটির পরিবারই দায়ী। তিনি সেদিন মনের রাগ-ক্ষোভ চাঁপা দিয়ে তাঁর প্রিয় কুকুরকে দাফন করেছিলেন। তবে এটা থেকে তিনি দঢ় সংকল্প করেছিলেন যে, এসব ইহুদিদের তিনি তার কুকুরের চেয়েও কষ্ট দিয়ে মারবেন, যা ইতিহাসের কুখ্যাত হলোকাস্ট নামে পরিচিত।

এখন আসল কথায় আসা যাক। উপরের ঘটনা ঘটেছিলো বলেই হিটলারের মনে ইহুদিদের সম্পর্কে এতো নেতিবাচক ধারণা জন্ম নিয়েছিলো। এখন ধরুন হিটলারের অস্তিত্বই ছিলো না, তাহলে কেমন হতে পারতো আজকের দুনিয়া? সেখানে কি আমূল কোন পরিবর্তন আসতো নাকি যা হওয়ার তাই হতো। এই চিন্তা থেকেই আমার উপপ্রেয়মূলক (hypothetical) আলোচনা সবার সামনে তুলে ধরলাম।

১) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কখনই হতো না

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার অন্যতম কারণ ধরা হয় ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে হিটলারের জার্মানি কর্তৃক পোল্যান্ড আক্রমণকে কেন্দ্র করে। সেই অতর্কিত হামলার জের ধরে পরবর্তীকালে মিত্রদেশ ফান্স ও বৃটেন যুদ্ধে জড়িয়ে পরে। হিটলার এমন পাল্টা আক্রমণের আশংকা থেকেই আগে-ভাগেই নিজের দল ভারী করার লক্ষে ইতালির ফ্যাসিবাদী নেতা বেনিতো মুসোলিনি এবং জাপানের সম্রাট হিরোহিতোর সাথে অক্ষশক্তি (Axis Powers) গড়ে তুলেন, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে আরো ভয়াবহ ও দীর্ঘতর করে তোলে। হয়তো হিটলার না থাকলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কখনোই শুরু হতো না, আবার ইউরোপের ৬ কোটি মানুষও প্রাণ হারাতো না।

২) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কখোনই একক শক্তিধর রাষ্ট্র হতো না

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই ১৮৯০ এর দশক থেকেই নিজেদের শক্তিমত্তার জানান সারা দুনিয়ায় দিতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৯৮ সালে মনরো মতবাদের (Munro Doctrine) দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর আমেরিকায় নিজের প্রভাব বিস্তার করার জন্য কিউবার স্বাধীনতা সংগ্রামে সরাসরি জড়িয়ে যায় এবং সফলতার সাথে স্পেনকে বিতাড়িত করে। একইভাবে  ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালিন সময় যুক্তরাষ্ট্র বৃটেন-ফ্রান্সকে চরম প্রতাপশালী জার্মানি কর্তৃক নিশ্চিত পরাজয় থেকে রক্ষা করে নিজেকে জড়িয়ে এবং এতে যুদ্ধের মোড় পুরোটাই পাল্টে যায়। যার ফলে মার্কিন শক্তিমত্তা পুরো ইউরোপ অনুধাবন করতে পারে। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আর লিগ অব নেশন গঠনের সময় মার্কিন সেনেটের সম্মতি না থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ১৯১৯ সাল থেকে১৯৩৯ সালের আগে পর্যন্ত গোটা দুনিয়ার শাসনব্যবস্থা থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখে।

পরবর্তীতে হিটলার কর্তৃক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে এবং ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপান কর্তৃক হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পার্ল হার্বারে আক্রমণ হলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে যায় এবং পরবর্তিতে বৃটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে মিত্রশক্তি গঠন করে। এর ফলে পুরো বিশ্বযুদ্ধের স্রোত বদল হয়ে যায়। উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অংশগ্রহণ করার পূর্বে বৃটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন জার্মানি দ্বারা প্রবলভাবে আক্রান্ত হয় এবং এর ফলে সেসব দেশের সামরিক শক্তি ও অর্থনীতি ব্যাপকহারে ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে জাপানে দুটি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একক পরামানিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে জানান দেয়, যেটার রেশ এখনো বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় টের পাওয়া যায়। অন্যদিকে বৃটেন- ফ্রান্স অতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে খবরদাড়ি করার সুযোগই পায় নি, যেহেতু যুদ্ধপরবর্তি ইউরোপের উন্নয়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র “মার্শাল পরিকল্পনা” (Marshall Plan) হাতে নেয়। এর ফলে পশ্চিম ইউরোপের যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা পায় । আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও সুযোগ বুঝে গোটা দুনিয়ার অর্থনৈতিক ও শাসনব্যাবস্থা নিজেদের সুবিধামতো ঢেলে সাজাতো লাগলো, যার দরুন তারাই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক শক্তির দেশ এবং একে টেক্কা দেওয়ার মতো চীন ও রাশিয়া ছাড়া বর্তমানে কারোর পক্ষেই সম্ভব না।

৩) সমাজতন্ত্র পূর্ব ইউরোপ হয়ে গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তো না

১৮৪৮ সালে কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস রচিত “দ্যা কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো” কে কেন্দ্র করেই রাশিয়ার বলশেভিক নেতা ভ্লাদিমির লেনিন ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর রাশিয়াকে ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’ নামকরণ করেন, যা মার্ক্সের ‘সমাজতন্ত্র’ মতবাদের কেন্দ্রস্থল এবং সর্বপ্রথম ‘সমাজতান্ত্রিক’ রাষ্ট্র হওয়ার গৌরব লাভ করে। সবাইকে সমান করার মূলমন্ত্রে দীক্ষিত “সমাজতন্ত্র” স্বাভাবিকভাবেই তৎকালীন বিশ্বের পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ঘোরতোর বিরোধী ছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি পরাজিত হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন অতিদ্রুত পূর্ব ইউরোপের দেশ তথা পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, বেলারুশ, এস্তোনিয়া,লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া, যুগোস্লাভিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, ইউক্রেন ইত্যাদি দেশে ‘মোলোটভ পরিকল্পনা’র (Molotov Plan) নামে জোড় পূর্বক দখল করে নয়তো একটি কমিউনিস্ট সরকারের পত্তন ঘটিয়ে শক্তিশালী সোভিয়েত বলয় তৈরি করে। পরবর্তিতে এই সমাজতন্ত্র গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে যায়, যেমন হো চি মিন কর্তৃক সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনাম প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭৬ সালে, সোভিয়েত প্রিমিয়ার জোসেফ স্টালিনের আদর্শ থেকেই চীনের বৈপ্লবী নেতা সমাজতান্ত্রিক চীন প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৪৯ সালে। আর্জেন্টিনার বৈপ্লবী নেতা চে গেভারা এবং কিউবার ফিদেল কাস্ট্রো কর্তৃক ১৯৫৬ সালে সমাজতান্ত্রিক কিউবা প্রতিষ্ঠিত হয়। হয়তো হিটলারের জন্ম না হলে সমাজতন্ত্র এতোটা প্রসার পেতো না। আবার প্রসার পেলেও সেটা বেশিদিন স্থায়ী হতো না। একটা সময় ঠিকই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা ইউরোপের পুঁজিবাদী শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে বিলিন হয়ে যেতো।

৪) জাতিসংঘের অস্তিত্বই থাকতো না

১৯১৯ সালে ভার্সাই চুক্তির জের ধরে লিগ অব নেশন্স প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্ব শাসনব্যাবস্থায় অমূল পরিবর্তন আনতে বদ্ধপরিকর ছিলো। কিন্তু বৃটেন-ফ্রান্সের একক অধিপত্য আর নানান সময় সংঘটিত যুদ্ধ বন্ধ করতে না পারার অব্যবস্থাপনার কারণে এর অস্তিত্বই তখন প্রশ্নের মধ্য পড়ে যায়। সেই সাথে হিটলার কর্তৃক ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রান্ত হলে লিগ অব নেশন্সের সকল প্রাতিষ্ঠানিক দূর্বলতা সার্বসামক্ষে প্রকাশিত হয়ে যায়। এর ফলে এক প্রকার বাধ্য হয়েই ১৯৪১ সালে বৃটেন-আমেরিকা কর্তৃক আটলান্টিক চার্টার এবং ১৯৪৪ সালে ব্রেটন-উডস বৈঠক এবং ইয়াল্টা বৈঠকের পর বৃটেন-আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়ন সংবলিত মিত্রশক্তি জাতিসংঘ তথা United Nations প্রতিষ্ঠা করতে দৃড় পরিকল্প হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিসমাপ্তির পর। এরই জের ধরে বিশ্ব-শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত বহুজাতিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘের যাত্রা ১৯৪৫ সালের ২৪শে অক্টবর থেকে শুরু হয়। হিটলারের অস্তিত্ব না থাকলে আমরা বর্তমান দুনিয়ায় লিগ অব নেশন্সের সকল অব্যবস্থাপনাই দেখতে পেতাম এখনো।

৫) এশিয়ায় এবং আফ্রিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশ এখনো থেকে যেতে পারতো

ইউরোপীয় দেশ নানান কায়দায় ১৮৫৬ সালের দিকে একে একে আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জোড়পূর্বক উপনিবেশ গড়ে তোলা শুরু করে। কিন্তু ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বৃটেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল, বেলজিয়াম প্রভৃত বিভিন্ন উপনিবেশিক দেশ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সমুখ্যিন হয় এবং তাদের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। অপর দিকে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ইউরোপীয় উপনিবেশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার দাবী জোড়দার হওয়া শুরু করে। এতো কিছু সামাল দিতে না পেরে আর আমেরিকা সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক চাপ সৃষ্টি হওয়ায় এক পর্যায় বৃটেন, ফান্স, বেলজিয়াম ও পর্তুগাল এশিয়া ও আফ্রিকায় অবস্থিত বিভিন্ন দেশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। হিটলার না থাকলে সেদিক দিয়ে আমরা এখনো বৃটেনের উপনিবেশ থাকতাম।

৬) ইউরোপীয় ইউনিয়ন কোনদিন হতো না

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার শিকার মনে হয় না ইউরোপের চেয়ে কেউ বেশি হয়েছিলো। একে তো পুরা ইউরোপ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো, অপরদিকে লাখ লাখ মানুষ উদবাস্তু হয়ে পড়েছিলো যুদ্ধের ভয়াবহতায়। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক ১৯৪৬ সালে পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের আগ্রাসন এবং ১৯৪৯ সালে দ্বিতীয় পরমাণু শক্তিধর দেশ হওয়ার পর পূর্ব ইউরোপের দেশ তথা ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, ইতালি ও স্পেন ১৯৫৮ সালে European Coal and Steel Community তথা বর্তমানের European Union এর যাত্রা ও কার্যকলাপ শুরু করে দেয়। প্রথমে মাত্র ৬টি দেশ নিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে এর সদস্যদেশ বাড়তে থাকে। একটা পর্যায় ১৯৮৭ সালে ঐতিহাসিক শেঞ্জেন চুক্তি (Schengen Treaty) এর আওতায় শেঞ্জেনভুক্ত দেশগুলোতে সাধারণ মানুষের পাসপোর্টবিহীন যাতায়তব্যবস্থা এবং সর্বজনীন মুদ্র্যা ইউরোর (Euro) প্রচলনের জন্য ১৯৯২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তি (Treaty of European Union) অনুমোদিত হয়। উল্লখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যাবসায়ী সংঘ হিসেবে শুরু হলেও তা পুরো ইউরোপকে একত্রিত করেছে। কারণ যুদ্ধ কখনো প্রবৃদ্ধি আনে না, বরং বিনা স্বুল্কের ব্যাবসা বাণিজ্য শান্তি ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে আসে। হয়তো হিটলারের অস্তিত্ব না থাকলে ইউরোপ এখনো রণক্ষেত্র হয়ে থাকতো, ব্যবসা বাণিজ্য এবং শান্তি ও প্রবৃদ্ধির কোন বালাই থাকতো না।

৭) পরমাণবিক বোমা আবিষ্কার হতো না

আমি এখানে ‘কোনদিন’ শব্দটি ব্যবহার করিনি দুটি কারণে। প্রথমত, মানুষ প্রগতিশীল প্রাণী; সে আজ হোক কাল হোক প্রয়োজনের বশে ঠিকই পরমাণু হতে উৎপন্ন শক্তি আবিষ্কার করতো। দ্বিতীয়ত, আমরা হয়তো শুরুতেই পারমাণবিক বোমার বদলে পারমাণবিক বৈদ্যুতিক চুল্লির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার দেখতে পেতাম।

আমরা সবাই জানি আলবার্ট আইনস্টাইন (জার্মান বংশোদ্ভূত ইহুদি), রবার্ট অপেনহাইমার (জার্মান বংশোদ্ভূত আমেরিকান ইহুদি), এনরিকো ফার্মি (ইতালিয় ইহুদি) ইত্যাদি প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী হিটলার কর্তৃক ইহুদিদের উপর করা নির্যাতন থেকে রেহাই পেতে জার্মানি থেকে সুদুর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পারি জমিয়েছিলেন। তাঁরা কিন্তু সেখানে বেকার বসে থাকেন নি, বরং আমেরিকার সরকারকে তাঁদের সকল আবিষ্কার ও তত্ত্ব দিয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন। যার ফলস্রুতিতে ৬ ও ৯ আগস্ট ১৯৪৫ সালে পরমাণবিক বোমার ভয়াবহতার সাক্ষী হলো গোটা দুনিয়া, একে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি নামক দুটি বৃহত্তম শিল্প শহর ধ্বংস করে যুক্তরাষ্ট্র জানান দিলো একক পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে। হিটলার না থাকলে হয়তো আইন্সটাইন ও ফার্মি কোনদিন আমেরিকায় পাড়ি জমানোর প্রয়োজনবোধ করতেন না; তবে পরমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র আর আমেরিকা হতো না অন্য যেই হোক না কেন।

৯) মধ্যপ্রাচ্যের ক্যান্সার নামক “ইজরাইল” এর অস্তিত্ব থাকতো না 

নিজে মুসলমান বলে এমন মন্তব্য করছি না। স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার কর্তৃক ইহুদিরা গণহারে হত্যা আর নির্যাতিত হয়েছিলো,, যার রেশ ধরে হলোকস্টের সুত্রপাত হয় এবং ৬০ লাখ ইহুদি মারা যায়। এই হলোকস্টকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে ইহুদিদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার দাবী আরো জোড়ালো হয় আমেরিকান এবং ইউরোপীয় ধনকুবের ইহুদিদের কর্তৃক। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যেরক্যান্সারতথা ইজরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়। আর এই ইহুদি রাষ্ট্রের কারণেই ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা এবং মধ্যপ্রাচ্যে এতো সমস্যা গৃহযুদ্ধে বেশিরভাগ দেশ জর্জরিত।

৯) স্নায়ু যুদ্ধ হতো না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে

এতোদিন পূঁজিবাদ ও সমাজবাদের মাঝামাঝিতে ছিলো ফ্যাসিবাদ, যার প্রবক্তা ছিলেন বেনিতো মুসোলিনি এবং এডলফ হিটলার। কিন্তু ১৯৪৫ সালে পুঁজিবাদ (আমেরিকা ও বৃটেন) এবং সমাজবাদ (সোভিয়েত ইউনিয়ন) কর্তৃক যৌথ আগ্রাসনে ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয় এবং একটি শুন্যতা সৃষ্টি হয়, যা নিয়ে পরবর্তিতে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক স্নায়ুযুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৯৪৫ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত। হয়তো হিটলার না থাকলে আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার মতবাদের লড়াই কখনোই হতো না বা হলেও সেটাতে নিশ্চিতভাবে পূঁজিবাদের জয় হতো। আবার আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধ না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে অর্জন করা খুবই কঠিন হতো।

সুতরা, হিটলার না থাকলে বর্তমান কালের নানান জটিলতা থেকে পৃথিবী রেহাই পেতো, আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে পৃথিবী ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতো। এখন ভাবুন তো, হিটলার থেকে কি কি লাভ হয়েছে আমাদের?

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured