Homeবিবিধহ্যাপি সাইন্স: এক বিচিত্র ধারার ধর্মবিশ্বাস

হ্যাপি সাইন্স: এক বিচিত্র ধারার ধর্মবিশ্বাস

ভুমিকা

মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে কি করে? সে হয় বিসিএস বা সরকারি ব্যাংকে চাকুরির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করে (বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে), কোন ব্যাক্তিমালিকানাধীন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানে জীবিকার জন্য যোগদান করে বা হয়তো নিজেই কোন ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসে। যেখানে জীবিকা আহরণ করাই অগ্নিপরীক্ষা, সেখানে নিজের বানানো নতুন ধর্মবিশ্বাস প্রবর্তন করা কি একটু বেশিই বিলাসিতা মন হয় না!

১৯৮৬ সালে ঠিক সেই কাজটি করেছিলেন জাপানের কোন এক ব্যাক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সাধারণ কর্মকর্তা, ত্রিশ বছর বয়সী রিউহো ওকাওয়া।[1] রিউহো ওকাওয়া শুধু একটি নতুন ধর্মবিশ্বাস প্রবর্তন করেন নি, তিনি রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন তাঁর নতুন ধর্ম দিয়ে। ধর্মটির নাম দিয়েছিলেন Happy Science বা “হ্যাপি সাইন্স “, যা বৈজ্ঞানিকভাবে আধ্যাত্নিক এবং বস্তুতান্ত্রিক উপায়ে সুখ আরোহণের উদ্দিপনা দিয়ে থাকে।

“হ্যাপি সাইন্স” এর ধর্মমত এবং কার্যক্রম

বর্তমান পৃথিবীতে ৪,৩০০ টির মতো ধর্ম আছে। সব ধর্মেরই নিজস্ব আদবকেতা ও নিয়মাবলি রয়েছে। এর মধ্য থেকে ইসলাম, খ্রিষ্টান, হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী সবচেয়ে বেশি। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, সেসব ধর্মে ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে বিশাল বড় পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। হ্যাপি সাইন্স আবার সেদিক দিয়ে পুরোপুরি অন্যধাচের। সেখানে প্রতিষ্ঠাতা রিউহো ওকাওয়া নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবী করেন! তিনি এল কান্টেরে (El Cantere) বা ঈশ্বরের ঈশ্বর!  কালক্রমে পূর্বজন্মে তিনি একাধারে ছিলেন যিশু খ্রিস্ট, গৌতম বুদ্ধ, ভাইকিং দেবতা ওডিন, গ্রিক দেবতা হার্মিস এবং প্রাচীন মিসরীয় দেবতা ওসাইরিস!  

১৯৮৬ সালে যাত্রা শুরু করা কোফুকু নো  কাগাকু বা হ্যাপি সাইন্স  প্রতিষ্ঠা লাভের ঠিক ৫ বছরের মাথায় ১৯৯১ সালে জাপান সরকার দ্বারা একটি ধর্ম-বিশ্বাস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। যদিও বেশিরভাগ জাপানিরা এটাকে ধর্ম-বিশ্বাসের চেয়ে কাল্ট (Cult) বা অন্ধভাবে পালন করা কোন বিশ্বাস মনে করে। রিউহো ওকাওয়া তাঁর এই ধর্ম সর্বসাধারণের মধ্যে প্রচারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে জাপানে একটি রাজনৈতিক দল হ্যাপিনেজ রিয়ালাইজেসন পার্টি (Happyness Realization Party বা সুখ অন্বেষণ দল), যেখানে তিনি চেয়ারম্যান বা সভাপতি। সেই সাথে তিনি বিভিন্ন গগণযোগাযোগ বা মিডিয়া প্লাটফর্ম যথা নিউ স্টার প্রডাকশন (New Star Production), এআরআই প্রডাকশন (ARI Production) এবং এইচএস পিকচার্স এন্ড স্টুডিও (HS Pictures and Studio) তৈরি করেছেন ধর্মটি প্রসারের লক্ষ্যে।[2] বলা বাহুল্য, জাপানের অনেক বিশ্ববিখ্যাত এনিমে (Anime) সিরিজ এবং জে-ড্রামা (J-Drama) সিরিজ এআরআই প্রডাকশন এবং এইচএস পিকচার্স এন্ড স্টুডিও নির্মাণ করার নজির স্থাপন করেছে।

ধর্মীয় বিশ্বাস

হ্যাপি সায়েন্সের মূল ধর্ম-বিশ্বাস হলো সঠিক মানসিকতার অন্বেষণ (Exploration of the Right Mind), সুখ অর্জনের জন্য চারটি পথ (The Fourfold Path) এবং এল কান্টেরের (El Cantere) এর উপর পূর্ণ বিশ্বাস।[3] রিউহো ওকাওয়া মনে করেন ইহলৌকিকভাবে সুখ অর্জনের জন্য চারটি পথ আছে মাত্র, ১) ভালোবাসা (Love), ২) প্রজ্ঞা (Wisdom), ৩) স্ব-প্রতিবিম্ব (Self-Reflection) এবং ৪) অগ্রগতি (Progress)। ভালোবাসা ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকার কোন আকাঙ্খা থাকে না, ভালোবাসাই মানুষে-মানুষে মেল-বন্ধন স্থাপন করে হিংসা-বিদ্বেষ-রাগ-অভিমান ভুলিয়ে। প্রজ্ঞা মানুষকে সঠিক উপায়ে এবং সঠিকভাবে সুখ অর্জনের পথ প্রদর্শন করে, যা আছে জীবনে তা দিয়ে সুখ অর্জন করা সম্ভব। সুখ অর্জনের জন্য অঢেল অর্থ বা বিত্তের প্রয়োজন হয় না।  গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের “Know Thyself” বা নিজেকে সবার আগে চিনো এর উপর ভিত্তি করে প্রতিটি মানুষের উচিত অন্যদের অবস্থান বুঝে নিজেকে উপলব্ধি করতে শেখা। আর পরিশেষে, অগ্রগতি ছাড়া মানুষের জীবনে পরিপূর্ণতা আসে না। সেই পরিপূর্ণতা লাভের জন্য সীমিত অর্থ এবং সামর্থ্য দিয়ে হলেও মানুষের অগ্রগতি লাভের জন্য ” Thinking outside the box” বা বাক্সের বাহিরে চিন্তা করতে পারার সামর্থ্য থাকা উচিৎ।  

ধর্মীয় গ্রন্থ

এখন কথা হলো হ্যাপি সায়েন্সের মূল ধর্ম-গ্রন্থ কি কি? ধর্মটির প্রতিষ্ঠাতা রিউহো ওকাওয়া ১৯৮৭ সালে তিনটি বই প্রকাশ করেন। একটির নাম The Laws of the Sun (সৌর্য তত্ত্ব), The Golden Laws (স্বর্ণ তত্ত্ব) এবং The Laws of Eternity (চিরন্তন তত্ত্ব)। এই তিনটি বইকে সম্মিলিত ভাবে হ্যাপি সায়েন্সের ধর্ম-গ্রন্থ বলা হয়ে থাকে, যেখানে রিউহো ওকাওয়া আধ্যাত্মিক জগতের বাহিরে কিভাবে সঠিক উপায়ে আমাদের ইহলৌকিক জিনিস দিয়ে সুখ অর্জন করা যায় তার সুবিন্যস্ত বর্ণনা করেছেন। আবার পরবর্তীতে তিনি The Dharma of the Right Mind (সঠিক মনের ধর্ম) প্রকাশ করেন হ্যাপি সায়েন্সের পরিপূর্ণ ধর্ম-গ্রন্থ হিসেবে।[4]

ধর্মীয় উপাসনালয় এবং অনুসারী

বর্তমানে সারা দুনিয়ায় হ্যাপি সায়েন্সের ১.১ কোটি স্বঘোষিত অনুসারী আছে। অনুসারীদের ধর্মীয় উপাসনালয়ের নাম “শোজা” বা “শোশিনকান”। মূলত, হ্যাপি সায়েন্সের বস্তুবাদী ও আধ্যাত্মিক জীবনাদর্শের জন্য পশ্চিমা বিশ্বের অনেকেই এই ধর্মের উপর আকৃষ্ট হয়েছেন। ১৯৯৪ সালে স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই এতো অনুসারী হয়ে যাওয়ায় তাদের জন্য নিউ ইয়র্কে ” হ্যাপি সাইন্স  ইউএসএ” শাখা খোলার সিদ্ধান্ত নেন ধর্মটির প্রতিষ্ঠাতা রিউহো ওকাওয়া।  বর্তমানে হ্যাপি সায়েন্সের ব্রাজিল, বৃটেন, অস্ট্রেলিয়া, ভারত এবং দক্ষিণ কোরিয়াতে শাখা-প্রশাখা রয়েছে এই ধর্মের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য।

সমালোচনা

তবে হ্যাপি সাইন্স  নিয়ে স্বয়ং জাপানের উঁচু মহল এবং মধ্যবিত্তদের মধ্যে রয়েছে ধোয়াশা ও অবিশ্বাস। এরই মধ্যে বলেছি এই ধর্মকে বেশিরভাগ মানুষই কাল্ট (Cult) মনে করে। বিংশ শতাব্দীতে জাপানে যেসব নতুন ধর্মচর্চার পত্তন হয়েছে (শিনশুকিও), হ্যাপি সায়েন্সের গায়েই সবচেয়ে বেশিবার “বিতর্কিত ধর্মচর্চা” তকমাটি লেগেছে, বিশেষ করে মূলধারার যোগাযোগ মাধ্যম এবং জনগণের মাঝে। জাপানকে যতোই উন্নত বিশ্বের তকমা দেওয়া হোক না কেন, প্রথম বিশ্বের দেশ বলা হোক না কেন, জাপানের জনগণের যান্ত্রিক জীবনযাপন, পারিবারিক ও পেশাদার জীবনের হতাশা ও ব্যার্থতা এবং বাহিরের দুনিয়ায় কি হচ্ছে না হচ্ছে তা নিয়ে আগ্রহ না থাকার দরুনেই কিন্তু হ্যাপি সায়েন্সের মতোন নতুন ধর্মমত বা শিনশুকিও ব্যাঙের ছাতার মতোন জেগে উঠেছে। মানুষ নিজেদের হতাশা ও ব্যার্থতা থেকে নিস্তার পেতে প্রতিষ্ঠিত ধর্ম বাদ দিয়ে এসব ধর্মে আকৃষ্ট হচ্ছে।[5]   

সবচেয়ে অবাক করা জিনিস হলো হ্যাপি সাইন্স  প্রচন্ড রকম জাপানি জাতীয়তাবাদী এবং সম্রাজ্যবাদী সমর্থন করে। তারা মনে করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পূর্বে জাপানের সেনাদের দ্বারা চীনের নানঝিং এ সংঘটিত রোমহষর্ক গণহত্যা এবং কোরিয়দের উপর করা অন্যায়-অত্যাচার ন্যায়সংগত কারণে সঠিকই ছিলো।[6] তাদের ভাষ্যমতে বরঞ্চ চীন ও কোরিয়ার জনগণের অসভ্য জীবন ব্যাবস্থা এবং জাপানের শাসনের উপর বিদ্রোহ ঘোষণা করাই এই গণহত্যার জন্য দায়ী। যদিও জাপানের সরকার বরাবরি হ্যাপি সায়েন্সের এমন আজগুবি চিন্তাভাবনার কারণে বহির্বিশ্বের কাছে বরাবরই বিব্রতবোধ করেছে বা করে আসছে। এমনি এক বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে রিউহো ওকাওয়ার জেষ্ঠ সন্তান হিরোশি ওকাওয়া ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই ধর্ম থেকে বেড়িয়ে আসেন। জনপ্রিয় জাপানি সংবাদপত্র সুকান বুনশুনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সরাসরি হ্যাপি সায়েন্সের ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং ঘোষণা দেন যে যদিও রিউহো ওকাওয়া তাঁর বাবা, তিনি কোনদিনই তাঁর বাবাকে এল কান্টেরে মনে করে উপাসনা করেন নি।[7] এজন্য এখন অবধি বাবা ও ছেলের মধ্যে মামলা-পাল্টা মামলা মোকদ্দমা লেগেই আছে সেই ২০১৮ সাল থেকে।

উপসংহার

এখন হ্যাপি সাইন্স  কোন প্রতিষ্ঠিত ধর্মবিশ্বাস না আজগুবী অসুস্থ চিন্তাধারা তা আপনাদের উপর ছেড়ে দিলাম। সবারই নিজেদের ধর্ম পালনের অধিকার আছে। কিন্তু ধর্ম গড়ে উঠেই বিশ্বাস, ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, বিবেক ও যুক্তির উপর নির্ভর করে। যে ধর্ম যুক্তির তোয়াক্কা না করে মানুষকে ভুলভাল জীবনাদর্শ দিয়ে থাকে, সেটা অবশ্যই কোন ধর্ম না। দিন কে দিন হ্যাপি সায়েন্সের অনুসারী ধীরে ধীরে পশ্চিমা বিশ্বে বেড়েই চলছে। এমনকি আমাদের বাংলাদেশের কিছু কিছু মানুষ গোপনে এই ধর্ম অনুসরণ করে। হয়তো সামনে এমনও হবে যে হ্যাপি সাইন্স  খুব শীঘ্রই আমাদের দেশেও তাদের শাখা-প্রশাখা জনসমক্ষে খুলে বসবে। তাই কোন ধর্মকে ঘৃণা না; বরং ধর্মকে জেনেশুনে বিচার করাকেই সমীচীন বলে মনে করি। তবে ব্যাক্তিগত ভাবে বললে এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসল্লি, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টানদের মাঝে এই ধর্ম বাজার পাবে বলে আমি অন্ততপক্ষে বিশ্বাস করি না।

[1] Kestenbaum, S., 2020. Inside the Fringe Japanese Religion That Claims It Can Cure Covid-19. [online] The New York Times. Available at: <https://www.nytimes.com/article/happy-science-japan-coronavirus-cure.html>

[2] Donelly, B., 2015. Blooming ‘Happy Science’ religion channels Disney, Gandhi, Jesus and Thatcher. [online] The Age. Available at: <https://www.theage.com.au/national/victoria/blooming–happy-science-cult-channels-disney-ghandi-jesus-and-thatcher-20151028-gkkzow.html>

[3] HS, n.d. Teachings –. [online] Happy Science New Zealand. Available at: <http://www.happyscience.org.nz/teachings/>

[4] Shimazono, S., 2004. From salvation to spirituality. 1st ed. Melbourne, Vic.: Trans Pacific Press, p.267.

[5] Saint-Guily, S., 2012. Happy Science Is the Laziest Cult Ever. [online] Vice. Available at: <https://www.vice.com/read/my-afternoon-with-a-failed-japanese-cult>

[6] Oshino, M., 2013. Thinking That Attracts Wealth (Part 3). [online] The Libertyweb global. Available at: <http://eng.the-liberty.com/2013/4451/>

[7] Shimuzu, T., 2018. 清水富美加と結婚させられそうになった!?大川隆法長男「独白」報道の衝撃 (2019221) – エキサイトニュース. [online] エキサイトニュース. Available at: <https://www.excite.co.jp/news/article/Asagei_122169/>

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured