Homeইতিহাসআফগানিস্তান সংকট (প্রথম পর্ব)

আফগানিস্তান সংকট (প্রথম পর্ব)

তালেবান কিভাবে সংগঠিত হল? আফগানিস্তানে কেন সবসময় যুদ্ধ চলে? তালেবানের বর্তমান মোটিভ কী?

এইসব ব্যাপারগুলো ডিটেইল্সে বুঝতে হলে, আপনাকে আফগানিস্তানের ইতিহাস এবং ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে অবগত হতে হবে। আমি এই লিখার ভিতরে তালেবানের আগমনের আগে অবধি আফগানিস্তানের চিত্র ও ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

আফগানিস্তান এবং তার ইতিহাস দেশটির ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছে।এটি বিভিন্ন বাহিনীর জন্য একটি ট্রানজিট দেশ ছিল এবং প্রায়শই শক্তিশালী দেশ এর মধ্যে চেপে বসেছে।যাইহোক, এর রুক্ষ পাহাড়ি ভূখণ্ড সেই দেশের মানুষকে আক্রমণগুলির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা দিয়েছে।এবং এর পাশাপাশি দেশের রাজধানী কাবুল থেকে গ্রামের স্বাধীন গোষ্ঠী-সমাজে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা বিস্তারে বিভিন্ন শাসকদের প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করতে অবদান রেখেছে।

জানা যায়, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য থেকে হর্ষ-বর্ধন শাসনামল অবধি আফগানিস্তান ভারতবর্ষেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং এর বেশির ভাগ মানুষই ছিলেন হিন্দু ধরমালম্বি। ৩০০ শতাব্দীতে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট আফগানিস্তানকে তার পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে আর আরবি প্রভাব (Arabic influence) বৃদ্ধির ফলে আফগানিস্তানে ইসলামীকরণ ঘটে প্রায় ৬০০ খ্রিস্টাব্দীতে এসে। একাদশ এবং দ্বাদশ শতাব্দীতে, দেশটি মঙ্গোলীয়ান আক্রমণের শিকার হয়, প্রথমে চেঙ্গিস খানের অধীনে এবং তারপর তৈমুর লং-এর নেতৃত্বে। ১৫০০ এর দশকে তাদের উত্তরসূরি বাবর, কাবুলকে তার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে শক্তিশালী মুঘল সাম্রাজ্যকে ভারতীয় উপমহাদেশে বিস্তৃত করেছিলেন। পারস্যের শাসক নাদের অবশ্য ১৭৩৯ সালে আফগানিস্তান থেকে মঙ্গোলদের বিতাড়িত করতে সফল হন। ১৭৪৭ সালে, নাদের-এর আফগান দেহরক্ষীদের অধিনায়ক, আহমদ শাহ আফগানিস্তানে দুররানি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন যা ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল। যদিও নবগঠিত রাজ্য দ্রুত ভেঙে যায়, তবে আহমদ শাহকে আফগান জাতির প্রতিষ্ঠাতা বলে মনে করা হয়। এই বিষয়গুলো থেকে অনুধাবন করা যায় যে বিশেষ করে ভারতবর্ষ আক্রমণ করা বা দখল করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মহল দেশটিকে তাদের সেফ প্যাসেজ হিসেবে ব্যবহার করেছে।

এইবার আসা যাক, এই যুগের আফগানিস্তানের যেই ক্রাইসিস তার মূল ঘটনাগুলোতে। আপনি যদি এশিয়ার ম্যাপটা ভালো করে দেখেন, দেখবেন, আফগানিস্তান দেশটির অবস্থান এমন একটি জায়গায় যার এক পাশে রাশিয়া এবং আরেক পাশে পাকিস্তান ও ভারত অবস্থিত। এখন ১৮০০ সালের দিকের কথা চিন্তা করলে, তখন এক পাশে ছিল রাশিয়া এবং আরেক সাইডে ছিল ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া। আর ঠিক এই কারণেই, আফগানিস্তান তার দুই শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তাল ছিল – উত্তরে রাশিয়া এবং দক্ষিণ -পূর্বে ব্রিটিশ ভারত। তখন এই রাশিয়া ও ব্রিটিশদের মধ্যে যেই বিরোধ, এর একটা নাম দেয়া হয়েছিল, ‘দ্য গ্রেট গেম’।

আফগানিস্তান সম্পর্কে সম্পূর্ণ আইডিয়া না থাকার কারণে কোন দেশই ১৮৩৮ সালের আগে আফগানিস্তান আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। কিন্তু একজন স্কটিশ ট্রাভেলার, Alexander Burnes প্রথম আফগানিস্তান ভ্রমণ করার পর, পশ্চিমা বিশ্ব এই দেশটি সম্পর্কে ভালো মতো জানতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সেই বছরেই ব্রিটিশরা প্রথম আফগানিস্তান আক্রমণ করে। সেই সময় আফগানিস্তানের আমির ছিলেন দোস্ত মোহাম্মদ খান (Emir Dost Mohammad Khan)। ব্রিটিশরা প্রথমেই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে তারপর তাদের পক্ষের লোক শাহ সুজাকে ক্ষমতায় বসায়। এই যুদ্ধকে প্রথম অ্যাংলো-আফগান ওয়্যার (Anglo-Afghan War) বলে আখ্যায়িত করা হয়। তখন আফগানিস্তানের কোন নিজস্ব আর্মি ছিলনা, বিভিন্ন গ্রামের তরুণদেরকে যুদ্ধে পাঠানো হইতো আর গ্রাম-প্রধানের মাধ্যমে আমির তাদের পারিশ্রমিকের টাকা পাঠিয়ে দিতেন। কিন্তু এই সুজার সময়ে, তারা আর টাকা পেত না, সেই কারণে সব গ্রাম প্রধান মিলে একটি কমিটি গঠন করে যার নেতৃত্ব দেন আকবর খান।

এই যুদ্ধ প্রায় তিন বছর ধরে চলে। ব্রিটিশদের ভারি ভারি অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও তারা হেরে যায়।দোস্ত মোহাম্মাদ খানকে আবার রাজা বানানো হয়। বলে রাখি যুদ্ধর পরে শাহ সুজাকে মেরে ফেলা হয়।

প্রথম অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধের মধ্যে, আমির দোস্ত মোহাম্মদ সফলভাবে তার এই বহুজাতিক দেশকে একত্রিত করতে সক্ষম হন। ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশরা আবারও আফগানিস্তান আক্রমণ করে আর এইবার ব্রিটিশ বাহিনী জয়ী হয়। দ্বিতীয় যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা তৎকালীন আমির আবদুর রহমান খানকে সমর্থন করে।শেষ দুই দশক ধরে শক্তিশালী আমির আবদুর রহমান খান তার পূর্বের আমির দোস্ত মোহাম্মদের কাজ অব্যাহত রেখেছিলেন। আব্দুর রহমানকে আইরন আমিরও (Iron Amir) বলা হয়। আব্দুর রহমান তার জীবনের একটি সময় ধরে তুর্কমেনিস্তানে বসবাস করেছিলেন এবং  মুসলিম জনগণকে রাশিয়ার সম্প্রসারণের শিকার হতে দেখেছিলেন। তার পর্যবেক্ষণগুলি তার দক্ষ বৈদেশিক নীতির ভিত্তি তৈরি করে এবং এই সময়কালে (১৮৯৩ সালে) তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাথে দেশের সীমানা স্থাপন করতে সক্ষম হন, যাকে বলা হয় আফগানিস্তান এবং ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে ডুরান্ড লাইন। ডুরান্ড লাইন বর্তমানে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানকে ভাগ করে রেখেছে।

দ্বিতীয় যুদ্ধের পরে আফগানিস্তানের বেশ কিছু অংশ ব্রিটিশরা তাদের আয়ত্তে আনতে পারলেও, তারা সরাসরি আমিরের প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ করে নি। কারণ, তাদের উদ্দেশ্য ছিল শুধু এই ট্রানজিটে প্রভাব বিস্তার করা, শাসন করা নয়। অনেকে মনে করেন মরু ও অনুন্নত দেশ হওয়ার কারণে এই জায়গাটা থেকে ব্রিটিশরা কোন রকমের অর্থনৈতিক সুবিধা পেত না, তাই হয়তো সরাসরি শাসন চলানোটাকে তারা অকেজো ভেবেছিল।

২য় যুদ্ধের পরে তো আফাগানিস্তান ছিল ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত এলাকা। ১৯০৭ সালে রাশিয়া স্বীকৃতি দেয় যে আফগানিস্তান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত এবং তারা আফগানিস্তান আক্রমণ করবেনা বলেও আশ্বাস দেয়। কিন্তু ১৯১৮ সালে রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে লেনিন ক্ষমতায় আসে এবং আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তার করা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে আমির ছিলেন হাবিবুল্লাহ। তিনি ছিলেন একজন উদারপন্থী, যিনি আফগানিস্তানে আধুনিক শিক্ষার ধরন চালু করেছিলেন।প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য চাপ বাড়ছিল। আফগান বুদ্ধিজীবী মাহমুদ তারজী বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র চালু করেন এবং স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন লিখালিখি করতেন।১৯১৯ সালে বাদশাহ হাবিবুল্লাহকে হত্যার পর তার ছেলে আমানউল্লাহ সিংহাসন দখল করে।এইবার হয় তৃতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধ, এই যুদ্ধে আফগানিস্তান জয় অর্জন করে আর এতদিনের ব্রিটিশদের কব্জা থেকে মুক্ত হয়। ঠিক এই কারণে তৃতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধকে আফগানিস্তানের স্বাধীনতার যুদ্ধ (War of Independence) হিসেবে মানা হয়।

এই যুদ্ধের পরে ব্রিটিশরাও আফগানিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয় (৯ই আগস্ট, ১৯১৯)। কিন্তু বলা হয় ব্রিটিশরা এই যুদ্ধে ইচ্ছা করেই হেরে গিয়েছিল যেন শেষ-মেশ ডুরান্ড লাইন একটা ইন্টারন্যাশনাল বর্ডার হয় এবং ব্রিটিশরা ভারতের অংশে আফগানিস্তানের সেই জমিগুলা পায়, শেষে অবশ্য তাই হয়েছে।

আমানুল্লাহ খান স্বভাবত বেশ উদার এবং প্রগতিশীল রাজা ছিলেন।সোরায়া তারজি নামের এক মহিলাকে লাভ-ম্যারেজ করার মাধ্যমে তিনি আফগানিস্তানের ঐসময়ের পুরুষ সমাজের যেই বহুবিবাহ প্রথা ছিল সেটা ভাঙ্গেন। তিনি আমৃত্যু একমাত্র সোরায়া তারজি-এর সাথেই  বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। ১৯২৬ সালে রাজা আমানুল্লাহ খান আফগানিস্তানে প্রথমবারের মতো সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এতে করে আফগানিস্তান হয়ে ওঠে কিংডম অব আফগানিস্তান (kingdom of Afghanistan) এবং এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে আমানুল্লাহ খান হন রাজা আর তার সহধর্মিণী সোরায়া তারজি হন আফগানিস্তানের রাণী। রাজা রাণী দুইজন মিলে আফগানিস্তানের সমাজে বিশেষ করে নারীদের মধ্যে অনেক পরিবর্তন আনেন। তারা বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, নারী পুরুষের সমান অধিকার নিয়ে কথা বলেন, নারীদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, মেয়েদেরকে ডিভোর্স দেয়ার ক্ষমতা দেন, মানুষকে ধর্মনিরপেক্ষ হতে বলেন। ১৯২০-এর প্রথম দশকে, রাজা আমানুল্লাহ খান আফগানিস্তানে পশ্চিমা আধুনিকতা ছড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। তিনি তৎকালীন নারীদের হিজাব-বোরখা পরার যেই কঠোর বিধি ছিল তা তুলে নিয়ে পশ্চিমা পোশাক যেমন টপস, স্কার্ট ইত্যাদি পরার অনুমতি এবং উৎসাহ দিয়েছিলেন। এমন কি, রাণী সোরায়া তারজি নাকি কোন একদিন প্রকাশ্যে জনসাধারণের সামনে তার হিজাব ছিঁড়ে ফেলেন।এমন নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করার জন্য রাণী সোরায়া তারজিকে দ্য হিউম্যান রাইট কুইন অব আফগানিস্তান বলা হয়ে থাকে।

কিন্তু তাদের এইসব প্রচার অধিকাংশ মুসলিম আফগানিদের পছন্দ হয়নি যার কারণে বিভিন্ন সময়ে রাজার বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের বিভিন্ন গোত্র বিদ্রোহ করে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৯২৩-এর আলিজাই বিদ্রোহ, ১৯২৪-এর খোস্ত বিদ্রোহ এবং সর্বশেষ ১৯২৯ সালের আফগানিস্তানের গৃহযুদ্ধ। এর প্রত্যেকটি সংগঠিত হয় রাজা আমানউল্লাহ খানের পশ্চিমীকরণ এবং আধুনিকীকরণের সংস্কারের বিরুদ্ধে।

১৯২৩, ১৯২৪-এর বিদ্রোহগুলো ব্যার্থ হলেও ১৯২৯ সালের গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহকারীরা জয় লাভ করে। রাজা ও রাণী ভারতে পালিয়ে যান। গৃহযুদ্ধের পরে নতুন রাজা হন নাদির খান (ওরফে নাদির শাহ)। তিনি আবারও আফগানিস্তানে গ্রাম প্রধানদের বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের অনুমতি দেন। ১৯৩৩ সালে একজন ছাত্র কর্তৃক তাকে হত্যা করা হয়, তার স্থলাভিষিক্ত হন তার ১৯ বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ জহির (জহির শাহ)। তিনি টানা ৪০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। এই ৪০ বছর তিনি আফগানিস্তানের প্রচুর উন্নয়ন করেন। দুই দশক ধরে জহির শাহ তার দুই চাচা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিলেন, যারা পর পর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দ্বিতীয় চাচা একটি ‘লিবেরাল পার্লামেন্ট’ চালু করেছিলেন যা ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত একটিভ ছিল।

জহির শাহ-এর চাচাতো ভাই দাউদ খান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। দাউদ খান ১৯৫৫ সাল থেকে সামরিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য নিতে শুরু করেন-এই সাহায্য নেয়ার কারণে পরবর্তীতে তাদের সাথে একটা দ্বন্দ্ব হয়, যা অবশ্য আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু নয়।

 ১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যায় তখন ডুরান্ড লাইনকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের বর্ডার করে দেওয়া হয়। আফগানিস্তান তার বেশ কিছু জমি হারায়। স্বাভাবিকভাবে আফগানিস্তান এতে খুশি ছিলনা। বলে রাখি, আফগানিস্তান একটি বহুজাতিক দেশ এবং বেশিরভাগ সেখানে উপজাতি সমাজ। মানে আমাদের দেশে যেমন মেজরিটি বাঙ্গালি সেই দেশের ব্যাপারটা ঠিক এমন না। আফগানিস্তানে পশতুন, তাজিক, হাজারা, উজবেক, আইমাক, তুর্কমেন, বেলুচ, পাশাই, নুরিস্তানি, গুর্জার, আরব, ব্রাহুই, কিজিলবাশ, পামিরি, কিরগিজ, সাদাত এবং অন্যান্য আরও অনেক জাতি আছে। তার মধ্যে সবথেকে বেশি হচ্ছে পশতুন, যা প্রায় মোট জনসংখ্যার ৩৮% থেকে ৪২% এর মধ্যে। তো বর্ডারের দুই সাইডেই পশতুনদের আধিপত্য ছিল আর কি।ঠিক এই কারণেই আফগানরা পাকিস্তানে হতে থাকা  Separatist movement-এ যোগ দেয়। প্রধানমন্ত্রী দাউদ খানও তা সমর্থন করেন যার কারণে ১৯৬৩ সালে দাউদ খানকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়

পরের বছর ১৯৬৪ সালে জহির শাহ নতুন সংবিধান আনেন। সংসদ নির্বাচনের নিয়ম চালু করেন। এই নতুন সংবিধান অনুযায়ী রাজ পরিবারের কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেনা। এবং নারীদের ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল আবার তারা নির্বাচনে দাঁড়াতেও পারতো। এই সময়ে বুদ্ধিজীবীরা অধিক স্বাধীনতা ভোগ করেন; নারীরা কর্মক্ষেত্র এবং সরকারী চাকুরীতে প্রবেশ করতে শুরু করে।

১৯৭৩ সালে একটা ক্যু-এর মাধ্যমে দাউদ খান আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে ফেলে। সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ক্যুয়ের পরে দাউদ খান হন স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট আর আফগানিস্তানের অফিসিয়াল নাম হয় রিপাবলিক অব আফগানিস্তান। তার সাথে বিচার বিভাগ ও সংসদ ভেঙ্গে ফেলেন, মানে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। জিজ্ঞেস করতে পারেন জহির শাহকে মেরে ফেলা হয়েছে কিনা, জ্বি না, উনি ইটালিতে নির্বাসিত হন। এর মধ্যেও দাউদ খান কিছু ভালো কাজ করেন,তিনি  সব ব্যাংক-কে জাতীয়করণ করেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অনেক ভালো করেছেন, আফগানিস্তানকে ভ্রমনকারীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। ৬০এর দশকে আফগানিস্তান অনেক শান্তিপূর্ণ একটি জায়গা ছিল। এখানে পশ্চিমা পর্যটকদের আনাগোনা ছিল অনেক। একমাত্র ৬০-এর দশকেই আফগানিস্তানকে আমরা একটি আধুনিক ও পর্যটক-বান্ধব দেশ হিসেবে দেখতে পাই। এরপর থেকে শুরু হল আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ (Cold War)। এতদিন গ্রেট গেমের পাল্লায় পড়া আফগানিস্তান এইবার US আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মাঝের বাফার এস্টেট হল। বলতে পারেন তালেবানের সৃষ্টির সাথে এতো কাহিনীর কি সম্পর্ক? সম্পর্ক আছে, ব্রিটিশ, রাশিয়া, আমেরিকা সবাই আফগানিস্তানের দখল নিতে চেয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তাদের এক্সকিউজ ছিল এরা বর্বর জাতি, আমরা তাদের লাইফ-স্টাইল শেখাব, এখানে শিক্ষা ব্যাবস্থা চালু করবো ইত্যাদি। কিন্তু আসলে প্রত্যেকটা দেশই হয় আধিপত্য বিস্তার বা তাদের নিজস্ব সুবিধার জন্য এই ল্যান্ডকে তাদের কব্জায় রাখতে চেয়েছে, সেই কারণগুলো থেকে তালেবান সংগঠনের সৃষ্টি অবধি আরেকদিন আলোচনা করা যাবে।

RELATED ARTICLES

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured