Homeআন্তর্জাতিকহামাসের মহাকাব্যিক উত্থান ও ভূরাজনীতিতে এর প্রভাব

হামাসের মহাকাব্যিক উত্থান ও ভূরাজনীতিতে এর প্রভাব

উপক্রম

১৯৮৭ তে যখন হামাস প্রতিষ্ঠিত হয়, আল্লাহর উপর ভরসা আর যাইতুন গাছের ডাল ছাড়া অস্ত্র বলতে তেমন কিছুই ছিল না। পুরো গাজা ভূখন্ডের আয়তন মাত্র ৩৬৫ বর্গকিমি, ছোট শহর থেকেও ছোট। ইজরাইলের সামরিক শক্তি, বিশ্বমোড়ল ও সন্ত্রাসবাদে সহায়তাকারি সাম্রাজ্যবাদীদের মদদ আর ইজরাইলের অস্ত্রনির্মাণশিল্পের সাথে তুলনা করলে গাজার আকাশ চব্বিশ ঘন্টাই ইজরাইলি ড্রোনে ঢেকে থাকার কথা।

২০০৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ফিলিস্তিন ভূখন্ডে গণতন্ত্রায়নের সিদ্ধান্ত নেন। দেশে দেশে গণতন্ত্র রপ্তানি করাই ছিল উদ্দেশ্য। ততদিনে গণতন্ত্রের বেদিতে আফগানিস্তান-ইরাকের লক্ষ-কোটি বনি আদমকে বলি দেওয়া শেষ। ফিলিস্তিনেও নির্বাচন হয়েছিল। ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার উদ্দেশ্যে এবং নাগরিক ‘অধিকার’ সুরক্ষার লক্ষ্যে। মোড়লদের সব হিশাব উলটে দিয়ে হামাস নির্বাচনে অভূতপূর্ব বিজয়লাভ করে।

সাথে সাথেই গণতান্ত্রিক বেলুন ফুটো হয়ে যায়। হামাসের হাতে ক্ষমতা দেওয়া তো দূরে থাকুক, সরাসরি আমেরিকার অস্ত্রে ফাতাহ-হামাস রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়। গাজা হামাসের দখলে যায়। ফাতাহ নিয়ন্ত্রণ করে পশ্চিম তীর। বার্তাটা খুবই সোজা, যদি ধরতে পারেন- ইসলামকে হৃদয়ে ধারণ করলে, সাদা প্রভুদের দাসত্বে আপত্তি থাকলে আপনার কোন অধিকার নেই, গণতন্ত্র ফনতন্ত্র আপনার মত ‘অবাধ্য’দের জন্য নহে। খেয়ে-পরে বেচে থাকতে পারলেই শোকর, অন্তত জেলের কুঠুরিতেও যদি ঠাঁই দেয় সেটাও আপনার সৌভাগ্য, অন্তত শ্বাস তো নিতে পারছেন।

সেই থেকে গাজা অবরুদ্ধ। প্রায় বিশ লক্ষ মানুষের জন্য কোন উৎপাদন নেই, আমদানি নেই, রপ্তানি নেই, শিক্ষা নেই, চিকিৎসা নেই, স্বাভাবিক জীবন নেই। থাকার মধ্যে আছে নিচে মাটি, উপরে আকাশ, সেটাও আবার ডেমোক্রেটিক-লিবারেল বোমারু বিমানের দখলে, গণতন্ত্র শিখাতে হবে তো! গাজাকে বলা হয় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ উন্মুক্ত কারাগার। ইরাকেও অবরোধের ফলে প্রায় দশ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

রকেট হামলার সূত্রপাত এবং আয়রন ডোম

গাজা থেকে ইজরাইলে প্রথম রকেট ছোঁড়া হয় ২০০১ সালে। রেঞ্জ ছিল মাত্র তিন কিমি! ইজরাইলের সাদিরুত (Sderot) শহরে এটি আঘাত হানে। বিস্ফোরক ক্ষমতা ছিল নিতান্ত নগণ্য। ২০০৮ সালের যুদ্ধে কাসসাম ব্রিগেড (হামাসের সামরিক শাখার নাম কাসসাম ব্রিগেড। হামাস আরবি এক্রোনিম, পুরো নাম হরকাতুল মুকাওয়ামাতিল ইসলামিয়্যাহ বা ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন। যে রকেট ছোঁড়ে সেটার নাম ছিল কাসসাম-৩, ১৭ কিমিঃ যার রেঞ্জ। কোনমতে গাজা সীমান্ত অতিক্রম করতে পেরেছিল।

২০১০ থেকে ইজরাইলের তথাকথিত আয়রন ডোম সচল হয়। ইজরাইলি ও তাদের মিত্ররা তখন কাসসামের রকেটকে বলত কার্টুন। নিয়মিত হাসি ঠাট্টা করত। ২০১২ সালে হামাসের নেতা আহমাদ জা’বরিকে গুপ্তহত্যার প্রতিবাদে হামাস আবার রকেট হামলা চালায়। প্রথমবারের মত তাদের রকেট ইজরাইলের কলিজায় গিয়ে আঘাত হানে- তেল আবিব ও কুদসে। সেবার তারা M-75 ব্যবহার করেছিল। রেঞ্জ ছিল ৮০ কিমি।

২০১৪ সালের সর্বগ্রাসী লড়াইয়ে গাজা যখন পুরোপুরি ধ্বংস্তুপ, হামাসের রকেট হাইফা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। R160 ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবহার করেছিল যার রেঞ্জ ১৬০ কিলোমিটার। এই ঘটনার পর ইজরাইলের ঠাট্টা-বিদ্রূপ উবে যায়। চতুর্দিক থেকে গাজাকে এমনভাবে অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয় যে অস্ত্র তো দূর কি বাত, মশা-মাছি ঢুকারও উপায় ছিল না।

ভেবেছিল এবার হামাস আর ক্ষেপনাস্ত্র উন্নয়ন করতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবে এর পরপরই হামাসের শুধু ক্ষেপনাস্ত্র নয়, বরং গোটা অস্ত্র শিল্পেই রীতিমত বিপ্লব ঘটে। মিনিটে মিনিটে ইজরাইলি ড্রোনের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে অস্ত্র কারখানা মাটির নিচে নিয়ে যায়। ২০১৪ সালের যুদ্ধে ইজরাইল পাগলের মত বোম্বিং করেছিল। প্রায় তিন কিলোমিটার জায়গাজুড়ে প্রতিটি ইঞ্চিতে বোমা ফেলেছিল। সাধারণ ফিলিস্তিনিদের কেউই এই ভয়াবহ আক্রমণের হেতু খুঁজে পায়নি।

যুদ্ধ শেষে জানা গেছে হামাস বেশ কয়েকজন ইজরাইলি সেনাসদস্যকে অপহরণ করেছে। এদেরকে জিম্মি করে বিপুল মুক্তিপন বা বন্দিমুক্তি চাইবে, সাথে নিজ দেশ ও ধৃত সৈন্যদের আত্মীয়স্বজনের চাপ তো রয়েছেই। তাই ইজরাইলিরা ঢালাও বোম্বিং করেছে যেন তাদের বোমাতেই সৈন্যরা মারা যায়, কোনোভাবেই হামাসের হাতে বন্দি না হয়।

এই ঢালাও বোম্বিং অবরোধকালে হামাসের জন্য শাপেবর হয়েছে। হাজার হাজার অবিস্ফোরিত বোমা থেকে কাচামাল সংগ্রহ করে এগুলোকেই রকেটে পরিণত করেছে। বিশাল-বিপুল মজুদ গড়ে উঠে হামাসের। ইজরাইলের বোমা থেকে তৈরি রকেট ইজারাইলে আঘাত হানে ২০১৯ সালের মে তে। আক্রমনে বেশ কয়েকজন ইজরাইলি হতাহত হয়।

বর্তমানে হামাসের ক্ষেপনাস্ত্র ২৫০ কিমি পর্যন্ত অতিক্রম করতে পারে। চলমান লড়াইয়ে তারা ৫ মিনিটে ১৩০ টি রকেট ছুড়ে নিজেদের সক্ষমতা ও দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে।

আয়রন ডোম আদৌ কতটুকু কার্যকর?

২০১০-১১ থেকে ইজরাইল হামাসের রকেট প্রতিরোধে আয়রন ডোম ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু শুরু থেকেই এই প্রযুক্তি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। হামাসের ঘরোয়া রকেটের খরচ যেখানে মাত্র কয়েকশ ডলার, সেখানে আয়রন ডোম তৈরির আগেই প্রতিটি ইন্টারসেপ্টরের জন্য খরচ ধরা হয়েছিল মাত্র বিশ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার ডলার!! হামাস গোটা এক যুদ্ধে যত রকেট ছুঁড়ে সবগুলোর খরচ মিলেও কয়েকটা ইন্টারসেপ্টরের সমান নয়। বর্তমানে প্রতিটি ইন্টারসেপ্টরের খরচ ধরা হচ্ছে এক থেকে দেড় লাখ ডলার মাত্র!!

আয়রন ডোমে কাজ করা একাধিক সৈন্য এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এখানে কাজ করা সৈন্যদের মধ্যে ক্যান্সার রেট খুবই বেশি। যদিও ইজরাইলি সরকার ক্যান্সারের সাথে আয়রন ডোমের যোগসূত্র শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছে। এখানে কর্মরত সৈন্যদের ভাষ্যমতে এই প্রযুক্তিতে এত তীব্র তেজস্ক্রিয়টা হয় যে সিস্টেমের ভিতর বসে থাকলে মনে হয় জলন্ত চুলার উপর গরম পানির পাত্রে ফুটছে।

ইজরাইলের ভাষ্যমতে আয়রন ডোম ৯০ শতাংশ সফল। কিন্তু এই উচ্চমাত্রার সফলতা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান। তাদের মতে আয়রন ডোম সর্বোচ্চ ৬০% রকেট প্রতিহত করতে পারে। তাহলে বাকিগুলো যায় কোথায়? হামাসের রকেটগুলো মূলত আনগাইডেড, ফলে এগুলো যত্রতত্র পড়ে। লক্ষভেদ করতে পারে খুব কম রকেটই।

তবে দিন দিন হামাস অভূতপূর্ব সক্ষমতা অর্জন করছে। ২০১৪ সালের যুদ্ধে তাদের ছোড়া রকেটে ইজরাইলিদের মৃত্যুহার ১৪৮৪/১, অর্থাৎ প্রতি দেড় হাজার রকেটে একজন ইজরাইলি মরত। এবার হামাসের প্রতি ১৪২ টি রকেটে একজন করে ইজরাইলি মরছে। বুঝাই যাচ্ছে আনগাইডেড হলেও হামাসের লক্ষভেদ নিপুন থেকে নিপুনতর হচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে আয়াশ-২৫০।

ফাবিয়ান হিঞ্জের টুইটার ইনফোগ্রাফী

মধ্যপ্রাচ্যের রকেট ও মিসাইল গবেষক ফাবিয়ান হিঞ্জ কয়েকদিন আগে টুইটারে হামাসের রকেটগুলোর একটি চমৎকার ইনফোগ্রাফি দিয়েছেন। ইনফোগ্রফীটির বাংলা অনুবাদ নিচে দেওয়া রয়েছে।

২০১১,২০১২ ও ২০১৪ সালের যুদ্ধের চেয়ে এবারের যুদ্ধ অনেক ব্যতিক্রম।

প্রথমত এখন আরব দেশগুলো অস্থির। সব দেশে অস্ত্রের ঝনঝনানি, হাতে হাতে, ঘরে ঘরে, দলে দলে অস্ত্র। ফলে গোটা অঞ্চলজুড়ে হামাসের সহজ পদচারণা। ইয়েমেনে, সিরিয়ায়, লিবিয়ায়, সুদানে এখন প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। এসব সশস্ত্র দলগুলোর মধ্যে হামাসের সমমনা কিংবা সমমনা না হলেও অন্তত ইজরায়লে বিরোধিতায় একতাবদ্ধ বহু দল আছে।

উদাহরণ হিশেবে বলা যায় সিরিয়া থেকে নিক্ষিপ্ত রকেট। যদি ২০০৮ সালের যুদ্ধে এরকম রকেট আসত তার জন্য সিরিয়া সরকার দায়ি হত। কারণ সেখানে সরকার ছাড়া কারো হাতে অস্ত্র নেই। এখন বিষয়টি পুরোপুরি ভিন্ন। শত শত দল উপদল আছে সশস্ত্র। সরকারের জন্যও এটা প্লাস পয়েন্ট। খোদ সরকার নিজেও অস্ত্র দিয়ে ইজরাইলে আক্রমণ চালাতে উদ্বুদ্ধ করা অসম্ভব কিছু নয়।

তাছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটা দেশ বা অঞ্চল আক্রান্ত হলে এর প্রভাব আশপাশের দেশে অনিবার্যভাবেই পড়ে। এখন হামাসের চারদিকে অস্ত্র আর অস্ত্র, চাইলে যে কারো থেকে তারা অস্ত্র কিনতে পারে। যাদের থেকে নিবে তারা আবার অস্ত্র পাচ্ছে উন্নত বিশ্ব থেকে। তুর্কি, কাতারি, আমিরাতি, সৌদি, রুশ, মার্কিনি ও চিনা অস্ত্র আসছে, সেগুলো হাত বদল হয়ে হামাসের হাতে যাচ্ছে। একটা চেইন গড়ে উঠেছে।

দ্বিতীয় পরিবর্তন হচ্ছে আঞ্চলিক শক্তির উত্থান। ১৯৯১ পর্যন্ত বিশ্ব ছিল বাইপোলার বা দ্বিমুখী- একদিকে আমেরিকা আরেকদিকে সোভিয়েত। কিন্তু ১৯৯১’র পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বস্তুত সবখানে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে উঠে। বিশেষত তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে।

ইরাককে কুয়েতের বিরুদ্ধে উস্কে দিয়ে নিজের ত্রাতার ভূমিকায় নেমে, সৌদিসহ আশেপাশের ছোটবড় দেশগুলোকে ইরাক-ইরানের জুজু দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাটি গড়ে তোলা হয়। ২০০৩ পর্যন্ত বিগত এক দশককে বলা হয় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উত্থানের যুগ।

কিন্তু ইরাক যুদ্ধের পর থেকে পরিস্থিতি পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। একদিকে পুতিনের হাত ধরে রাশিয়ার পুনরুত্থান, অপরদিকে হিজবুল্লাহ, ইরান, সিরিয়ার সহায়তায় ইরাকের শিয়া-সুন্নি যোদ্ধাদের হাতে মার্কিনিদের বেদম মার খেয়ে পলায়ন। ইরাক যুদ্ধ আফগানিস্তানের পর শুরু হলেও সেই ২০১০-১১ তেই ইরাক ছেড়ে যাওয়ার পিছনে অন্যতম কারণ ছিল ইরাকি যুদ্ধাদেরকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উদার সহায়তা।

এই দশ বছরকে বলা হয় মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার পতনযুগ। শেষ পেরেক ঠুকে আরব বসন্তের মাধ্যমে। আরব বসন্তের পর আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভয়াবহ উত্থান ঘটে এবং তারাই মূল খেলোয়াড়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এই বিষয়ে দ্য ব্যাটল ফর সিরিয়া বেশ ভাল একটা বই, পড়ে দেখা যেতে পারে।

এখন মধ্যপ্রাচ্যে যত আঞ্চলিক উদীয়মান উচ্চাভিলাষী শক্তি আছে পৃথিবীর কোন অঞ্চল, বরং গোটা পৃথিবীজুড়েও নেই। সৌদি, ইরান, তুরস্ক এমনকি কাতার, আমিরাতের মত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভূখণ্ডের রাষ্ট্রও খেলায় নেমে গেছে। এতদিকের রশি টানাটানিতে লাভবান হবে হামাসের মত অন্যান্য দলগুলো। কোন না কোন দেশের সমর্থন তারা পাবেই।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা সম্ভবত হতে যাচ্ছে মিসরের দিক থেকে। মূলত ইজরাইল ২০১৪ সালের পর গাজাকে গলা টিপে মারতে সিসির দ্বারস্থ হয়। মিশরের সহায়তা ছাড়া গাজা অবরোধ সম্ভব নয়। বহির্বিশ্বের সাথে অবরুদ্ধ গাজাবাসির যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম, গাজার ফুসফুসতুল্য সুড়ঙ্গগুলো সিসিকে দিয়েই বন্ধ করে দেওয়া হয়। না পেরে অবশেষে গাজা সীমান্তজুড়ে মিসর কৃত্রিম খাল খনন করে সবগুলো সুড়ঙ্গ ডুবিয়ে দেয়।

এতেই শেষ নয়। মিসরকে সাথে নিয়ে সাগরেও ইজরাইল অবরোধ গড়ে তোলে। অস্ত্র তো অস্ত্র, গাজার জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে গেলেও লাশ হয়ে ফিরতে হয়। এই চুক্তিতেই সিসিকে ক্ষমতায় বসিয়ে থাকলেও আশ্চর্যের কিছুই নেই। কারণ মুরসির সবচেয়ে বড় অপরাধগুলোর একটি ছিল রাফাহ ক্রসিং খুলে দেওয়া। গাজাবাসিকে শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভ্রমণের জন্য মিশর অবাধ যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দেওয়া।

স্বভাবতই ইজরাইল ভেবেছিল ২০১৪ সালের পর হামাসকে গুড়িয়ে দেবে। সেই আশার গুড়েবালি। সব বিশেষজ্ঞরা একমত যে এখন হামাস চৌদ্দর চেয়ে অনেক অনেক বেশি শক্তিশালি। তাদের অস্ত্রভাণ্ডার অনেক সুসজ্জিত। এবং সেই অস্ত্র যেকোনভাবে একটা দুটো করে হলেও ইজরাইলে ভিতর ঢুকে যাচ্ছে। ইজরাইলি সেনাদের উপর গুলি চলছে।

সর্বশেষ পরিবর্তন আসছে হামাসের সক্ষমতায়। ১৯৯৪’র অসলো চুক্তির পর অনেক অমেরুদণ্ডি সুশীল ফিলিস্তিনিরা ভেবেছিল দ্বিরাষ্ট্র সমাধান নিয়ে তারা সুখেই থাকবে। কিন্তু দুইযুগ পরেও ফিলিস্তিনিরা রাষ্ট্রহীন। এবং দিন দিন এই রাষ্ট্রহীনদের সংখ্যা বেড়েই চলছে। চলমান সংঘাতও শুরু হয়েছে মূলত শেখ জাররাহ এলাকা থেকে সেই পুরুষানুক্রমে বসবাস করে আসা ফিলিস্তিনিদের উৎখাত কেন্দ্র করে।

হামাস সমস্যা সমাধানের আলটিমেটাম দিয়েছিল। নাহয় রকেট হামলার হুমকি দিয়েছিল। লাগাতার কুদসে নিপীড়নের প্রতিবাদে যখন হামাসের প্রথম রকেটগুলো ইজরাইলকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল বাহ্যত ইজরাইলের নাগরিক আরবরাও আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তুলছিল। হামাসের গ্রহণযোগ্যতা ইজরাইলের কলিজার ভিতরও ঢুকে গিয়েছে।

এবার তুরস্কের দৌড়ঝাঁপ চোখে পড়ার মত। নিসন্দেহে বড় পরিবর্তন আসবে। আগে কাতার একা ছিল। যেকোন কারণেই হোক তুরস্ক উচ্চবাচ্য করত না। যদিও আমি বহু বহু আগে তুর্কি ত্রাণবাহী জাহাজই গাজার অবরোধ ভাঙ্গার উদ্যোগ নিয়েছিল। সেই জাহাজে আক্রমণের ফলে ১৪ তুর্কি নাগরিক নিহত হওয়ার সূত্র ধরে জল বহুদূর গড়িয়েছিল।

এবং এই দৌড়ঝাঁপের প্রভাব এখনই পড়তে শুরু করেছে। বিগত দশ বছর ধরে যে সিসি গাজাবাসির জন্য কসাই হিশেবে আভির্ভূত হয়েছিল এখন তারও সুর নরম। খোদ মিশরে ইজরাইলি বোমা পড়ার কারণে জাতীয়তাবাদি মিশরিরাও ক্ষুদ্ধ। বহু বহু বছর পর সরকারঘনিষ্ঠ সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকরা ইজরাইলের সমালোচনা করছে, ফিলিস্তিনিদেরকে সহায়তা পাঠানোর প্রশংসা করছে।

সৌদি মূলত আমেরিকার দ্বারস্থ ইরান জুজুর কারণে। ইজরাইলের সাথে আরব রাষ্ট্রগুলো সখ্যতা গড়ে তুলছে ইজরাইলের প্রযুক্তি কেনার উদ্দেশ্যে। এখন সেই অস্ত্র যদি ইজরাইলের পরিবর্তে তুরস্ক সরবরাহ করে? পরিস্থিতি সেদিকেই যাচ্ছে। সৌদি তুর্কি অস্ত্র বিশেষত ড্রোন কিনতে আগ্রহী।

সবকিছু ষোলকলায় পূর্ণ হবে যদি হামাস ইজরাইলের রাডার জ্যামিং সিস্টেম করায়ত্ত করতে পারে। তাদের রকেটগুলোর মাঝে কিছু এন্টি এয়ারক্রাফটগান রয়েছে, রকেটের মত সেগুলোও যখন আরও উন্নত হবে। ইজরাইলের রাডার ফাকি দিয়ে হামাসের ড্রোন ইজরাইলে ঢুকেছে এবং ছবি পাঠিয়েছে তা নিশ্চিত, আল জাজিরার ইনভেস্টিগেশনে ড্রোনের পাঠানো ছবি সত্য ও নিখুঁত বলে প্রমাণিত হয়েছে।

তারপর ড্রোনের কী হয়েছে তা নিয়ে দুই ধরণের বক্তব্য। ইজরাইল বলছে তারা ড্রোন ভূপাতিত করেছে, হামাস বলছে ড্রোন নিরাপদে ফিরে এসেছে। পাশাপাশি তারা অস্ত্রবাহী ড্রোনের ছবি প্রকাশ করেছে।

তবে কোন কিছুই রাতারাতি পরিবর্তন হবে না। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে- বিশেষত শক্তির এই তারতম্য, ক্ষমতার ভারসাম্য হুট করে পালটে যাবে তা ভাবা বোকামি। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কিন্তু হামাস যেভাবে এগুচ্ছে সেভাবে এগুতে থাকলে নিসন্দেহে বলা যায়- নাসরুম মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহুন করিব।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Read

Featured